পায়ের যেসব লক্ষণে লুকিয়ে থাকতে পারে লিভারের সমস্যা

শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার। প্রোটিন তৈরি, পুষ্টি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শরীর থেকে বিভিন্ন বর্জ্য ও ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিভারের কার্যক্ষমতা কোনো কারণে কমে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে শরীরের বিভিন্ন অংশে। এমনকি কখনো কখনো পায়ের পাতা, গোড়ালি বা ত্বকেও দেখা দিতে পারে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এসব লক্ষণ শুধু লিভারের রোগের কারণেই হয় না—অন্য অনেক শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যালবুমিন নামের একটি প্রোটিনের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে তরলের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পা, পায়ের পাতা ও গোড়ালিতে পানি জমে ফুলে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পেরিফেরাল এডিমা বলা হয়। তবে হৃদযন্ত্র, কিডনি বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতার কারণেও পা ফুলে যেতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
পায়ের তলায় চুলকানি
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই পায়ের পাতা বা শরীরের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে চুলকানি থাকলে তা লিভারের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে কোলেস্টেসিসের মতো অবস্থায় পিত্তের উপাদান রক্তে জমতে শুরু করে, যা এই চুলকানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পায়ে ঝিনঝিন বা অসাড়তা
পায়ে বারবার ঝিনঝিন করা, জ্বালাপোড়া বা অসাড়তার অনুভূতি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। ডায়াবেটিস, স্নায়ুর সমস্যা কিংবা শরীরে পুষ্টির ঘাটতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগের সঙ্গেও এ ধরনের উপসর্গের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই এটিকে শুধু লিভারের রোগের নির্দিষ্ট লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ত্বক বা নখ হলদেটে হয়ে যাওয়া
লিভারের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে জন্ডিস দেখা দিতে পারে। এর ফলে ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যেতে পারে, এমনকি কখনো কখনো নখেও দেখা যেতে পারে হলদেটে ভাব। প্রাকৃতিক আলোতে এই পরিবর্তনটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট বোঝা যায়।
লাল বা বাদামি দাগ
পায়ের ত্বকে হঠাৎ অস্বাভাবিক লাল বা বাদামি দাগ দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। তবে এ ধরনের দাগের পেছনে রক্তসঞ্চালনজনিত সমস্যা কিংবা ত্বকের অন্য কোনো রোগও থাকতে পারে। তাই শুধু এই দাগ দেখেই লিভারের রোগ নিশ্চিত হওয়া যায় না।
স্পাইডার অ্যানজিওমাস
ত্বকের ওপর ছোট ছোট রক্তনালির জাল বা মাকড়সার জালের মতো লালচে দাগকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় স্পাইডার অ্যানজিওমা। দীর্ঘমেয়াদি লিভারের রোগে এই ধরনের দাগ দেখা যেতে পারে। তবে এমন দাগ থাকা মানেই যে লিভারের সমস্যা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয় বলে জানান চিকিৎসকরা।
চিকিৎসক অনুজ পাহুজার মতে, পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ নানা কারণেও এমনটা হতে পারে, কখনো কখনো এটি লিভারের সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত থাকে। তার ব্যাখ্যায়, লিভার যখন পর্যাপ্ত অ্যালবুমিন তৈরি করতে পারে না, তখন শরীরে তরল জমে পা ফুলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পা বা পায়ের পাতায় এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, সহজে রক্তপাত হওয়া কিংবা শরীরে পানি জমে যাওয়ার মতো অন্যান্য উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের প্রকৃত কার্যকারিতা যাচাই করে নেওয়া সম্ভব।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু পায়ের একটি লক্ষণ দেখেই কখনো লিভারের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। শরীরে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে সবসময় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



