উপজেলা সংবাদ: মিঠামইন

মিঠামইনে আগুনে পুড়ল দুই বাড়ি ও সারের গোডাউন
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে রান্নাঘর থেকে লাগা আগুনে দুটি বসতবাড়ি ও একটি সারের গোডাউন পুড়ে গেছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট কাজ করে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সদর উপজেলার গিরিশপুর গ্রামে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গিরিশপুর গ্রামের নূর হোসেনের বাড়িতে রান্না করার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে পাশের দিলীপ চৌধুরীর বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে নূর হোসেনের একটি সেমিপাকা বসতঘর, সারের গোডাউন ও ১৫টি ইউ-প্যাটার্নের ঘর পুড়ে যায়। ঘরগুলোর আলমারি, আইপিএস, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্রও পুড়ে গেছে। এতে প্রায় এক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, দিলীপ চৌধুরীর টিনশেড দোতলা বাড়িটিও আগুনে পুড়ে যায়। এতে ঘরের আসবাবপত্র, টেলিভিশন, ফ্রিজসহ বিভিন্ন মালামালের পাশাপাশি ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১০ লাখ টাকা পুড়ে গেছে বলে জানা গেছে। এ বাড়িতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। খবর পেয়ে মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে যান। তিনি জানান, স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রায় কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রান্না করার সময় আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানা গেছে। আগুনে দুটি বসতবাড়িসহ সারের গোডাউন পুড়ে গেছে।

মিঠামইনে হাওরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৩০
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে হাওরে মাছ ধরা ও রিং জাল চুরিকে কেন্দ্র করে বর্তমান ও সাবেক ইউপি সদস্যের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের ইমামনগর গ্রামে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরে মাছ ধরা ও রিং জাল চুরিকে কেন্দ্র করে ইমামনগর গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য হান্নান মিয়া ও সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল লতিফের স্বজনদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধ মীমাংসায় আজ শুক্রবার সকালে বৈরাটী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ইমামনগর গ্রামে সালিশের উদ্যোগ নেন। সালিশের আলোচনা শুরুর আগেই গ্রামের সামনের একটি মাঠে হঠাৎ দুই পক্ষের লোকজন দা, বল্লম ও টেটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বৈরাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, দুই পক্ষের বিরোধ মীমাংসার জন্য সালিশে বসতে তিনি ইমামনগর গ্রামে যান। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বসিয়ে রেখেই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সংঘর্ষ থামানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. দিদারুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিঠামইনে পুকুরের পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু
কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে পুকুরের পানিতে ডুবে ৭ বছর বয়েসী দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ গোপদিঘী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা দক্ষিণ গোপদিঘী গ্রামের আব্দুল কাদির মিস্ত্রির মেয়ে হাফিজা (৭) এবং জুয়েল নম মন্ডলের ছেলে জয়ন্ত নম মন্ডল (৭)। স্থানীয়রা জানায়, বাড়ির পাশে পুকুরের ধারে খেলা করছিল হাফিজা ও জয়ন্ত। খেলার ছলে কোন এক সময় পুকুরে নামলে তলিয়ে যায় দুজনেই। স্বজনেরা তাদের পুকুরপাড়ে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে থাকে। অনুমানবশত পুকুরের পানিতে গিয়ে খুঁজতে থাকলে দুজনের মরদেহের সন্ধান পায়। পরে মরদেহ উদ্ধার করে স্বজন ও স্থানীয়রা। মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

মিঠামইনের রহস্যাবৃত ‘দিল্লির আখড়া’
‘দিল্লির আখড়া’ নামটির মধ্যেই রয়েছে ঐতিহাসিক ছাপ। স্থানটি ভারতের দিল্লির কোনো অংশ নয়। তবে, ভারতের দিল্লির সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে এ স্থানটিতে। কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অধ্যুষিত মিঠামইন উপজেলার শেষ প্রান্তে এর অবস্থান। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিবিজড়িত এই দিল্লির আখড়াকে কেন্দ্র করে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা। আখড়ার চারিদিকে এই বিশাল জায়গায় রয়েছে প্রায় তিন হাজার হিজল গাছ। প্রাচীন এই আখড়া আর হিজল গাছগুলো হাওরের এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি, যা প্রকৃতি প্রেমিদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। দিল্লির আখড়ার প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে জানা যায়, দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে সাধক নারায়ণ গোস্বামী এই আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। আখড়ার সেবায়েত বৈষ্ণবদের মতে দিল্লি আখড়ার বর্তমান বয়স প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর। কিশোরগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ আছে, বিধঙ্গলের ‘রামকৃষ্ণ গোসাই’র মতাবলম্বী বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আখড়ার মধ্যে মিঠামইনের দিল্লির আখড়াটি বিখ্যাত। হাওর এলাকার অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই আখড়া। নদী তীরে হিজল গাছের সারি, প্রাচীন দেয়াল ও অট্টালিকা, ভিতরে অপূর্ব সুন্দর পরিবেশে যে কোনো আগন্তুককে কাছে টানবে। আখড়ার ভেতরে রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধক নারায়ণ গোস্বামী ও তার শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি। আরো রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর। আখড়ার দুই দিকে রয়েছে দুটি পুকুর। আর আখড়ার চারপাশে বিশাল এলাকাজুড়ে মৃত্তিকা বিদীর্ণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আখড়ার সময়কালের প্রায় তিন হাজার হিজল গাছ। দিল্লির আখড়া ও হিজল গাছগুলোকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে কিংবদন্তি। গা ছমছম করা সে কাহিনী শুনে কিছুক্ষণের জন্য যে কেউ হারিয়ে যাবেন অন্য ভূবণে। প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগের কথা, দিল্লির আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা আধ্যাত্মিক সাধু নারায়ণ গোস্বামী ছিলেন পার্শ্ববর্তী বিতলঙ্গের আখড়ার আধ্যাত্মিক সাধক রামকৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ্য। সে সময় এলাকাটি ঝোপজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল, কোনো হিজল গাছ ছিল না। এলাকাটির চতুর্দিকে ছিল নদীবেষ্টিত। ফলে আখড়ার এলাকাটিকে মনে হতো দ্বীপের মতো। এ নদীপথে কোনো নৌচলাচল করতে পারত না। রহস্যজনক কারণে এ নদীপথে চলাচলকারী নৌকা ডুবে যেত বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হতো, একদিন এ নদীপথে দিল্লির সম্রাট প্রেরিত একটি কোষা নৌকা মালামালসহ ডুবে যায়। আরোহীরা অনেক চেষ্টার পরও কোষাটি উঠাতে গিয়ে ব্যর্থ হন এবং তাদের একজন সর্পদংশনে মারা যান। বিতলঙ্গের সাধক রামকৃষ্ণ এ খবর পেয়ে শিষ্য নারায়ণ গোস্বামীকে এখানে আসার নির্দেশ দেন। গুরুদেবের নির্দেশ মোতাবেক সাধক নারায়ণ গোস্বামী এখানে এসে নদীর তীরে বসে তপস্যারত হলেন। হঠাৎ অলৌকিক ক্ষমতা বলে কে যেন তাকে হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়। ঐশী মতাবলে তিনি তীরে উঠে আসেন। এভাবে প্রায় ৭ দিন একই ঘটনা ঘটান। একদিন দৈববাণীর মতো কে যেন বলল, আপনি এখানে থাকতে পারবেন না, এখান থেকে চলে যান। উত্তরে সাধক বললেন, তোমরা কারা? উত্তর আসল আমরা এখানকার বাসিন্দা। পূর্ব-পুরুষ ধরে এখানে আছি। আপনার কারণে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। সাধক বললেন, তোমরা স্পষ্ট হও, অর্থাৎ রূপ ধারণ কর। সঙ্গে সঙ্গে তারা একেকটা বিকট দানব মূর্তি ধারণ করল। নারায়ণ গোস্বামী দেখলেন তার চারপাশে হাজার হাজার বিশালাকার দানব মূর্তি। যা দেখলে সাধারণত গা শিউরে উঠবে। এখন তাদের সঙ্গে সাধক নারায়ণ গোস্বামীর অনেক কথাবার্তা হয়। সিদ্ধান্ত হয় তিনিও থাকবেন, তারাও থাকবে। তবে তারা কারো কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং নারায়ণ গোস্বামীর নির্দেশ পালন করবে। সাধক নারায়ণ গোস্বামী তাদের আদেশ করলেন, তোমরা আমার চতুর্দিকে সবাই হিজল গাছের রূপ ধারণ কর। তখন দানবদের প্রধান সাধুকে অনুরোধ জানিয়ে বললেন, সে যে হিজল গাছের মূর্তি ধারণ করবে, সেই গাছের নিচে বসে তপস্যা করতে। সাধু সে অনুরোধ মেনে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি দানব একেকটি হিজলগাছের মূর্তি ধারণ করল। প্রতি অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে এখানে ভোগ দেয়া হয়। আখড়ার ৩৭২ একর জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অদ্ভুত আকৃতির কয়েক হাজার হিজল গাছ। যা দূর দূরান্তের পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে। এদিকে সাধক নারায়ণ গোস্বামী তার ঐশী ক্ষমতাবলে সেই ডুবে যাওয়া কোষাটি মালামালসহ উঠিয়ে দেয় এবং সর্প দংশনে মৃত ব্যক্তিটিকেও বাঁচিয়ে তোলেন। পরে দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে এ খবর পৌঁছানোর পর তিনি এখানে এসে সাধক নারায়ণ গোস্বামীর নামে বিশাল এলাকা লাখেরাজ দিয়ে একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করে দেন। সেই থেকে আখড়াটি ‘দিল্লির আখড়া’ নামে পরিচিতি হয়ে আসছে। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১২১২ সালে আখড়ার নামে একটি তামার পাত্রে ওই জমি লিখে দেন। কিন্তু ১৩৭০ সালে ডাকাতরা এই পাত্রটি নিয়ে যায় বলে আখড়ার সেবায়তরা জানান। দিল্লির আখড়ায় প্রতি বছর ৮ চৈত্র মেলা বসে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের সবাই মেতে ওঠেন উৎসবে।