বিভাগ: জাতীয়
মোট খবর: 43 টি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের বৈঠক: জ্বালানি, কৃষি ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল। সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদারত্ব, রোহিঙ্গা সংকট, জ্বালানি, কৃষি ও জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে কথা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে কানাডার মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সংকট রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজেই নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখে আছে, তার ওপর এত মানুষের দীর্ঘ অবস্থান অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, মানবিক সহায়তা জরুরি হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। সংকটের শুরু মিয়ানমারে, তাই সমাধানও সেখানেই খুঁজতে হবে। কানাডার প্রতিমন্ত্রী এই অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছে কানাডা। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে দেশটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে বলে জানানো হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ কানাডা বাংলাদেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণে সহায়তা করতে চায়। এ ছাড়া নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও দক্ষ নার্স তৈরিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ জানিয়েছে দেশটি। এই খাতে কানাডার কিছু কার্যক্রম আগে থেকেই চলছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তার আগ্রহ জানায় কানাডা। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। বৈঠকে কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রসঙ্গও আসে। প্রধানমন্ত্রী জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সার ও বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা আছে সরকারের। এতে কৃষকদের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে, যা কৃষি খাতে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া এবং সরকারি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে কাজে লাগবে। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনায় কানাডার অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ সহায়তা পেতে পারে বলেও আলোচনায় উঠে আসে। ফ্যামিলি কার্ড ও দারিদ্র্য বিমোচন বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্র করে বর্তমান নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করা গেলে এবং এর সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত হলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব। তিনি জানান, সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে তাঁদের স্বনির্ভর করার ওপর জোর দিচ্ছে তাঁর সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়ন বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়েও কথা হয়। কানাডার প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার দিতে আগ্রহী তাঁর দেশ, আর বাংলাদেশ এই তহবিল থেকে উপকৃত হতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সহায়তা করতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা। প্রবাসীদের প্রশংসা ও সফরের আমন্ত্রণ কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা ও ইতিবাচক মানসিকতার প্রশংসা করেন রণদীপ সরাই। তিনি জানান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দুজন কানাডার সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বৈঠকের শেষে প্রধানমন্ত্রীকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কানাডার পক্ষে ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার অজিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ইউনূস আমলে পদায়ন বিতর্ক, এবার বদলি ব্যবস্থায় লটারির উদ্যোগ
সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপ সফল হলে সরকারি প্রশাসনে বদলি বাণিজ্য বন্ধের ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নির্ধারিত সময়ে এ লটারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোর জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সাবরেজিস্ট্রারের পদও এর বাইরে নয়। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক কিছু এলাকায় পদায়ন পেতে অনৈতিক লেনদেনের আশ্রয় নেওয়া হয়। ফলে একজন কর্মকর্তা যদি কোনো পদে যেতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বদলি বাণিজ্যের এই সংস্কৃতি কেবল সাবরেজিস্ট্রি অফিসেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পছন্দের কর্মস্থল, গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে অতীতে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে। একজন কর্মকর্তা যদি অর্থ ব্যয় করে একটি পদে দায়িত্ব নেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর সেখান থেকেই দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের পদায়ন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকার থানাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে অতীতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু ঊর্ধ্বতন পদ নয়, অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দায়িত্ব পাওয়ার জন্য ঘুষ দেন, তাহলে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কতটা সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন? নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিচার বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি বদলি ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকে, তাহলে তা পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে—এমন অভিযোগও সে সময় সামনে আসে। একই সময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সে সময় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে অনিয়মের সংস্কৃতি যে সহজে দূর হয়নি, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট জেলা বা কর্মস্থলের পদকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করা হয় এবং এসব পদে যেতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়েই একটি অনৈতিক লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। উচ্চপর্যায়ের কোনো কোনো পদ নিয়েও অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসকই ঢাকার বাইরে কর্মরত থাকতে অনাগ্রহী। এর অন্যতম কারণ দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অতিরিক্ত ঢাকামুখী হয়ে পড়া। ফলে রাজধানীতে থাকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে বদলি হতে নানা ধরনের তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। ইউনূস আমলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ব্যাপক বদলি নিয়েও আলোচনা হয়। তিন হাজার মেডিক্যাল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এত স্বল্প সময়ে অতীতে অধিদপ্তরে এমন ব্যাপক বদলি হয়নি—এমন কথাও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হয়েছে। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সরকারি চাকরি যাঁরা করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে কর্মরত থাকতে চান—এটি বাস্তবতা। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের দেশে সবাই যদি ঢাকায় চাকরি করতে চান, তাহলে ঢাকার বাইরের বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারি সেবা পাবে কীভাবে? চিকিৎসা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি, প্রকৌশলসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রভাব দেখা যায়। আর এর পেছনে বদলি ও পদায়নের বর্তমান ব্যবস্থারও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। এই বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—কোন কর্মকর্তা কোন কর্মস্থলে যাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমে আসবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের নির্ধারিত তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে। তবে শুধু লটারি চালু করলেই দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। লটারির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে লটারির পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরীক্ষাযোগ্য হওয়া জরুরি। তাহলে এই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সফল হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদেও এর প্রয়োগ নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যেমন জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণকারী কর্মকর্তাদের একটি স্বচ্ছ ফিট লিস্ট তৈরি করে সেখান থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা যেতে পারে। একইভাবে থানার ওসি কিংবা চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ বা তদবির ছাড়াই কোনো পদে দায়িত্ব পান, তাহলে সেই পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর একটি নৈতিক দায় তৈরি হয়। তখন পদটি পাওয়ার বিনিময়ে অর্থ ফেরত তোলার মানসিকতা থাকার কথা নয়। বরং কর্মদক্ষতা, সততা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তাই সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে শুধু একটি বদলি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হবে না। এটি সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং বদলি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন ধারণার সূচনা করতে পারে। সরকার চাইলে এই অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। দুর্নীতি কমাতে শুধু আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। বদলি ও পদায়ন যদি সেই দুর্বলতার অন্যতম জায়গা হয়, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতির এই উদ্যোগ তাই একটি সম্ভাবনাময় সূচনা। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত ও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা গেলে সরকারি চাকরিতে বদলি-বাণিজ্য কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার মান বাড়াতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশু অধিকার দিবস ও শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে পৌঁছালে ১৫০ জন শিশু তাকে বরণ করে নেয়। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা। পরে প্রধানমন্ত্রী অতিথিদের সঙ্গে নিজের আসনে বসেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। আজকের আয়োজনে রয়েছে শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের মধ্যে স্মারক উপহার বিতরণ, স্মরণিকা ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি কথোপকথনের কর্মসূচি। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের আঁকা ছবি ও একটি ফটো গ্যালারিও পরিদর্শন করবেন বলে জানা গেছে। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী যাবেন শিশু জাদুঘর ভবনে, যেখানে ভবনের নিচতলায় সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশনের উদ্বোধন করবেন তিনি। উল্লেখ্য, এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।

সেরা সাংবাদিকদের স্বীকৃতি দিল বসুন্ধরা গ্রুপ, পুরস্কার পেলেন ১৭ জন
বস্তুনিষ্ঠ ও মানসম্মত সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের ছয়টি সংবাদমাধ্যমের ১৭ জন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ‘জুন-২০২৬ সেরা সাংবাদিক’ সম্মাননার আওতায় নির্বাচিত সাংবাদিকদের হাতে সনদপত্র ও অর্থ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। শনিবার দুপুরে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান এবং এবিজি (আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ)-এর চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের পক্ষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারী ও ডিএমডি ফাইন্যান্স ইমরুল হাসান। এ সময় জানানো হয়, দেশ ও মানুষের কল্যাণে লেখনীর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের কাজের স্বীকৃতি দিতে বসুন্ধরা গ্রুপের সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে প্রতি মাসে ১২ জনকে মাসসেরা সাংবাদিক হিসেবে পুরস্কৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে জুন মাসের সেরা সাংবাদিকদের এই সম্মাননা দেওয়া হলো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠের সম্পাদক মেহেদী হাসান তালুকদার ও নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক একরামুল হক ভূঁঞা (লোটন একরাম) ও নির্বাহী সম্পাদক আফাজ উদ্দিন বিপ্লব, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক এ কে এম মঞ্জুরুল হক, ডেইলি সানের সম্পাদক মো. রেজাউল করিম লোটাস এবং নিউজ২৪ টিভির হেড অব নিউজ শরিফুল ইসলাম খানসহ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জুন-২০২৬ মাসের সেরা সাংবাদিক হিসেবে কালের কণ্ঠ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন শিমুল মাহমুদ। তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘চরম দুরবস্থায় সরকারি মেডিক্যাল কলেজ : শিখন ঘাটতিতে ডাক্তারি ডিগ্রি’। একই সংবাদমাধ্যমের সজীব আহমেদ পুরস্কৃত হয়েছেন ‘এক রিচার্জে ১৮০-২০০ ডিজিট, বিপাকে গ্রাহক’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। চট্টগ্রামের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার অনিক আখন্দ সম্মাননা পেয়েছেন ‘কর্তার দাপটে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অফিস হয়ে গেল রেস্ট হাউজ, কেনাকাটায় অনিয়ম’ শিরোনামের প্রতিবেদনের জন্য। বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন ইলিয়াস সরকার। তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘মৃত্যুদণ্ড নিয়ে কনডেম সেলে এক দশক : শিউলির পর এবার মুক্তি পাচ্ছেন মাশকুরা’। ইকরাম-উদ-দৌলা সম্মাননা পেয়েছেন ‘১৫ বছর পর পর এনআইডি নবায়ন করতে হবে’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। এ ছাড়া আবির রহমানের ‘কেপ ভার্দে-কুরাসাও পারলে বাংলাদেশ কেন পেছনে’, জিএম মুজিবুরের ‘ইট-পাথরের নগরে হারিয়ে যাচ্ছে পাখির আবাস, সংকটে বাস্তুতন্ত্র’ এবং চট্টগ্রাম ব্যুরোর মিজানুর রহমানের ‘পাহাড় হারাচ্ছে চট্টগ্রাম, বাড়ছে ঝুঁকি’ শীর্ষক প্রতিবেদন পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে সম্মাননা পেয়েছেন শামীম আহমেদ। তাঁর প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘কোটি টাকার কাগুজে গাছ দিচ্ছে না ছায়া!’। মাহবুব মমতাজী পুরস্কৃত হয়েছেন ‘অপরাধের কারখানা সোশ্যাল মিডিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। ইমরান রহমানের ‘ভয়ংকর জম্বি এখন বাংলাদেশে’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিও পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়। ডেইলি সান থেকে এহসানুল হক জসিম ও আসাদুল ইসলাম যৌথভাবে ‘Environmental justice turns into a wild goose chase’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য সম্মাননা পেয়েছেন। রফিকুল ইসলাম পুরস্কৃত হয়েছেন ‘SDG deadlines loom, PWD workforce still untapped’ শিরোনামের প্রতিবেদনের জন্য। মৌসুমী ইসলাম সম্মাননা পেয়েছেন ‘Can high rates revive investment?’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। নিউজ২৪ ও টি-স্পোর্টসের সংবাদকর্মীরাও এই স্বীকৃতির আওতায় এসেছেন। নিউজ২৪-এর সাজ্জাদ হোসেন পুরস্কৃত হয়েছেন ‘ঘুষের ফাঁদে প্রবাসীর স্ত্রী, তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে প্রতিমন্ত্রী’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য। অন্যদিকে, টি-স্পোর্টসের মোমিন রোহন সম্মাননা পেয়েছেন ‘বাবা হাসপাতালের প্রহরী, ছেলে জাকির বাংলার উসাইন বোল্ট, নতুন কুঁড়ির সেরা বালক স্প্রিন্টার’ শিরোনামের প্রতিবেদনের জন্য। ‘দেশ ও মানুষের কল্যাণে বসুন্ধরা গ্রুপ’—এই স্লোগান সামনে রেখে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারী বলেন, সাংবাদিকদের কাজের স্বীকৃতি দিতে প্রতি মাসেই এ সম্মাননা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। দেশ ও মানুষের কল্যাণে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান সব সময় সাধারণ মানুষের কল্যাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাঁর ঘোষণার আলোকে মানসম্পন্ন প্রতিবেদন তৈরিতে সাংবাদিকদের উৎসাহিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের ডিএমডি ফাইন্যান্স ইমরুল হাসান বলেন, গ্রুপের প্রতিটি সংবাদমাধ্যম থেকে মানসম্মত প্রতিবেদন নির্বাচন এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট ও নির্ধারিত কমিটি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। এতে বিভিন্ন বিটের সংবাদ ও প্রতিবেদনের গুণগত মান যথাযথভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সম্পাদকরা সাংবাদিকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করার এ উদ্যোগের জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ধন্যবাদ জানান। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ সম্মাননা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সাংবাদিকেরা আরও দায়িত্বশীল, অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন তৈরিতে উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক সংলাপ প্ল্যাটফর্ম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী আয়োজনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন নির্বাচিত সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, এখন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। পরিবারের মায়ের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছাতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও কৃষিসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে কৃষক কার্ড এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি। পরবর্তীতে ইউনিভার্সেল কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই হবেন নারী। তার ভাষ্যে, এসব কর্মী তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু সনদ অর্জনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে স্কুলের পোশাক, ব্যাগ, দুপুরের খাবার ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, আর স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগও সম্প্রসারিত করা হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অগ্রগতির বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোগকে সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান। কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা হবে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। পানি নিরাপত্তার জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি, পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও উল্লেখ করেন। পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী, পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন বাজার তৈরি ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ, আর শান্তি ও সম্প্রীতিকেই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। উল্লেখ্য, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এবারের সম্মেলনে শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিচ্ছেন। বিভিন্ন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরাও এতে অংশ নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট বরিস তাদিচ, সাবেক মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং সাবেক মালির প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘Fragments, Frontiers and Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Rewritten’। ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলা তিন দিনের এই আয়োজনে ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সংযোগ, জলবায়ু ও মানব নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসনসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।

পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শূন্য হলো মিষ্টির আসন: স্পিকার
সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগপত্র পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী পদত্যাগপত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার পদত্যাগ কার্যকর হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের টানেলে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের ২৩ নম্বর সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তার কার্যালয়ে এসে লিখিতভাবে একটি চিঠি জমা দিয়ে গেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এই চিঠি পাওয়ার পরপরই তার পদ শূন্য হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। স্পিকার আরও জানান, বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং আজ থেকেই এই পদত্যাগ কার্যকর হবে। পদত্যাগপত্রে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, সংসদের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য পদত্যাগ করলে সাধারণত এর পেছনের কারণ উল্লেখ করেন না।

সুশীল সমাজের তৎপরতা: উদ্বেগ, নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত?
দেশে কোনো অন্যায়, অনিয়ম, দখল, হামলা কিংবা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিবাদ করা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা তাঁদের নাগরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখনই, যখন একই ধরনের ঘটনায় তাঁদের অবস্থান সবসময় একই রকম থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একদল বিশিষ্ট নাগরিকের দুটি পৃথক বিবৃতি সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে- সুশীল সমাজ কি সব সময় একই মানদণ্ডে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ডকে মূল্যায়ন করে? সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে এসব ঘটনার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, গবেষণা, সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক পরিচিত ব্যক্তি স্বাক্ষর করেন। অন্যদিকে রাজধানীর বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের শোরুমে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে হামলা ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ নিয়েও ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বই বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। দুটি বিবৃতির বিষয়বস্তু আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট- দেশের নাগরিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা এবং মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকদের একটি অংশ। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। এই উদ্বেগ কি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি অতীতের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবস্থান নেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখল, মব-সক্রিয়তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ে গুরুতর বিতর্ক হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ই এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝা কঠিন। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও দেশের সামনে রয়েছে নানা জটিলতা। আগের সময়ের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার প্রভাব একদিনে দূর হওয়ার নয়। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে সরকারের আমলে সংঘটিত যেকোনো অপরাধ বা অনিয়মের দায়মুক্তিও কাম্য হতে পারে না। এখানেই সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। সমালোচনার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধারাবাহিক ও অভিন্ন মানদণ্ডে হয়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ে। কোনো সরকারের সময়ে দখল, হামলা, অগ্নিসংযোগ কিংবা মব-সহিংসতার বিরুদ্ধে সরব থাকা এবং অন্য সরকারের সময়ে একই ধরনের ঘটনায় নীরব থাকা- এমন অভিযোগ উঠলে সুশীল সমাজের নিজেদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। গত দেড় বছরের রাজনৈতিক পর্ব নিয়েও দেশে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। মব-সহিংসতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় হামলা, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। এসব ঘটনার প্রত্যেকটির সত্যতা, দায় এবং প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এসব ঘটনায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া কতটা দৃশ্যমান ছিল? বিশেষ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনার বিরুদ্ধে যখন ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক দ্রুত বিবৃতি দিয়েছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই কেউ কেউ অতীতের আরও বড় ও ব্যাপক ঘটনাগুলোর সময় তাঁদের অবস্থান কী ছিল, তা জানতে চাইতে পারেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাগুলো নিয়েও সমাজে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। এসব ঘটনার সময় নাগরিক সমাজের অবস্থান কতটা জোরালো ছিল- সেটিও ইতিহাসের আলোচনায় থাকা স্বাভাবিক। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি- কোনো ব্যক্তি কোনো ঘটনায় বিবৃতি দেননি বলেই তিনি সেই ঘটনার সমর্থক ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে কোনো একটি বিষয়ে বিবৃতি দেওয়াও কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ নয়। সুশীল সমাজের ব্যক্তিদের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে তাঁদের প্রকাশ্য বক্তব্য, কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারপরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এখানে ফিরে আসে- ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত, রাজপথে সহিংসতা, অবরোধ, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচন নিয়ে বিরোধ ক্রমেই গভীর হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। ওই সময় দেশের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সুশীল সমাজের একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। আবার অন্য একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক বিতর্কও হয়েছে। কেউ তাঁদের ভূমিকা দেখেছেন রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ মনে করেছেন, এর মাধ্যমে রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণেই বর্তমান সময়ে সুশীল সমাজের যেকোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা স্বাভাবিকভাবেই পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। ২০০৬–০৭ সালের পরিস্থিতি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। একইভাবে তখনকার ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশও বর্তমান সময়ের সঙ্গে অভিন্ন নয়। তাই কেবল কিছু মিলের ভিত্তিতে দুই সময়কে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। তারপরও প্রশ্নটি থেকেই যায়- সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক সরব হওয়ার পেছনে কি কেবল নাগরিক উদ্বেগ কাজ করছে, নাকি এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর অনুমানের মাধ্যমে নয়, বরং তাঁদের বক্তব্য, সময় নির্বাচন, অতীতের অবস্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেই খুঁজতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যেমন জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না, তেমনি নাগরিক সমাজের সমালোচনাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সরকারকে প্রশ্ন করা যেমন নাগরিক সমাজের অধিকার, তেমনি নাগরিক সমাজের অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়েও জনগণের প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ অতীতে রাজনৈতিক সংকটের অনেক পর্ব দেখেছে। নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সহিংসতা, জরুরি অবস্থা, অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘ শাসন- সবই এ দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অংশ। তাই নতুন কোনো সংকট তৈরি হলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই অতীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান ঘটনাগুলোর তুলনা করবে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সুশীল সমাজ যদি এসব বিষয়ে কথা বলে, তা গণতান্ত্রিক পরিবেশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই ভূমিকা তখনই আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন একই মানদণ্ডে সব সরকার, সব রাজনৈতিক শক্তি এবং সব ধরনের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্ট থাকবে। কারণ জনগণ শুধু জানতে চায় না- কী ঘটেছে। জনগণ এটাও জানতে চায়, একই ঘটনা ঘটলে সবার জন্য প্রতিবাদের ভাষা কি একই থাকে? সাম্প্রতিক দুটি বিবৃতি তাই শুধু দুটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের সুশীল সমাজের ভূমিকা, অবস্থানের ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক সংকটে তাদের দায়িত্ব—এই বৃহত্তর প্রশ্নগুলোকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

ফুটপাত উদ্ধারে কঠোর ডিএনসিসি, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা
রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির দীর্ঘদিনের চক্র ভাঙতে এবার কঠোর অবস্থানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। নগরবাসীর চলাচলের পথ দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি দখলদারদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। মিরপুর-১০-এ উচ্ছেদ অভিযানে হামলার পর ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন আরও কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ‘আমার লাশের ওপর দিয়ে হলেও’ ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজধানীর ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে ডিএনসিসির কঠোর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে যারা নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। নগরবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের বাধা বা হামলা মেনে নেওয়া হবে না। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রশাসক বলেন, উচ্ছেদ অভিযানে সিটি করপোরেশনের পরিবহন, পুলিশ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। শফিকুল ইসলাম খান বলেন, মিরপুর-১০-এর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ডিএনসিসি ও পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে। তদন্তের ভিত্তিতে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায়ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চলছে। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, নগরবাসীর প্রতি সিটি করপোরেশনের নৈতিক দায়িত্বও। তাই দায়িত্ববোধ থেকেই অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ কাজে নগরবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিএনসিসি জানিয়েছে, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটওভার ব্রিজের নিচের অংশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদের পর সেখানে গাছ লাগিয়ে নাগরিকদের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসির অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন প্রশাসক। মিরপুরবাসীর উদ্দেশে শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে, সাধারণ মানুষ ফুটপাত দখলমুক্ত চান। ভবিষ্যতে কারও ইন্ধনে আবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হকারদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, হকারদের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে কেউ ফুটপাতে বসবেন না। তাঁদের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে বৈধভাবে ব্যবসার সুযোগ দিতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ২০৪টি রেজিস্ট্রেশন কার্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর অনেকেই সেই সিদ্ধান্ত মানেননি। তিনি বলেন, ‘ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ। এখানে হকারদের বসতে দেওয়া হবে না।’ ডিএনসিসির এ অবস্থান মূলত ফুটপাতকে পুনরায় দখলমুক্ত রাখার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ অতীতে একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরও কিছু এলাকায় আবার দখল ফিরে আসার অভিযোগ রয়েছে। ডিএনসিসির কঠোর অবস্থানের মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত নিয়ে পরিচালিত অনুসন্ধানে দখল ও চাঁদাবাজির বিস্তৃত অভিযোগ সামনে এসেছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শত শত ফুটপাত ও ফুটপাতসংলগ্ন জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও দোকানপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বা বাতি বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কথাও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অপরাধী চক্রের সদস্যদের নামও এসেছে। তবে অনুসন্ধানে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মিরপুর-১০ নম্বর হোপের গলি ও পার্শ্ববর্তী ফুটপাতে কয়েক শ দোকান রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুর-১০-এর আইডিয়াল স্কুল ও সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ফুটপাত, রাড্ডা ও ফায়ার সার্ভিসসংলগ্ন এলাকাতেও একই ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। এ ছাড়া নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট, ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা, শ্যামপুর, শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগের কথা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতের বিভিন্ন অংশে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নীলক্ষেত মোড়, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা মার্কেট ও নূরজাহান মার্কেট এলাকার ফুটপাতকে কেন্দ্র করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নীলক্ষেত মোড় থেকে নিউমার্কেটের বিভিন্ন গেটসংলগ্ন ফুটপাতে শত শত দোকান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার, গাউছিয়া থেকে ইস্টার্ন মল্লিকা, রাফিন প্লাজা থেকে চাঁদনি চক এবং নীলক্ষেতের বিভিন্ন অংশেও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, নিউমার্কেটের ভেতরের ফুটপাতেও অবৈধ দখল ও অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। রাজধানীর দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতেও ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ধূপখোলা বাজার ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক দোকানকে ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথা পুলিশের একটি নথির বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্যামপুর মাইক্রো স্ট্যান্ডে যানবাহন থেকে দৈনিক অর্থ আদায় এবং শ্যামপুর কাঁচাবাজারের দোকানগুলো থেকেও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন ফুটপাতেও একই ধরনের অভিযোগের কথা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। কারওয়ান বাজার এলাকায় জনতা টাওয়ার, স্টেশন রোড, তেজকুনিপাড়া, ডিআইটি মার্কেট, মাছের আড়ত, ফলের বাজার ও বিভিন্ন দোকানসংলগ্ন ফুটপাতে দখল এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে রামপুরা, মগবাজার ও আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন ফুটপাতেও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও লাইনম্যানদের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অভিযোগের স্বাধীন যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ থাকলেও সময়ের সঙ্গে ছত্রছায়ার পরিচয় পরিবর্তিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে অর্থ আদায়ের কাজে অনেক ক্ষেত্রে একই লাইনম্যান ও ম্যানেজাররা সক্রিয় থাকলেও নতুন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, ফুটপাত দখলের সুযোগ করে দিয়ে একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। এ কারণে উচ্ছেদ অভিযানে ফুটপাত খালি করা হলেও কিছুদিন পর আবার সেখানে দোকান বসে যায়। অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, শুধু প্রান্তিক পর্যায়ের হকারদের উচ্ছেদ করলে ফুটপাত দখলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হকাররা চাঁদা দিয়ে ফুটপাতে বসেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযানের সময় তাদের সরিয়ে দিলেও এর পেছনে থাকা প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় থাকলে আবারও দখল তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, ফুটপাত দখলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, নির্দিষ্ট এলাকায় ও নির্দিষ্ট সময়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া এবং হলিডে মার্কেট ব্যবস্থাকে কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দখল ফিরে আসার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ড. তৌহিদুল হক বলেন, ফুটপাত দখলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী শক্তির ভূমিকা থাকলে তা শনাক্ত করা জরুরি। অন্যথায় শুধু হকার উচ্ছেদ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন। ফুটপাত দখল নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা। মাইসফট হ্যাভেনের (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি এবং এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনা বা নতুন দখল শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব। তিনি প্রতিটি ফুটপাতের নির্দিষ্ট ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে জিআইএসভিত্তিক ডেটাবেসে সংরক্ষণেরও পরামর্শ দেন। এতে কোন ফুটপাতের কতটুকু অংশ বৈধভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং কোথায় অবৈধ দখল হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি অ্যাপ বা হটলাইন চালু করা যেতে পারে বলেও তিনি মত দেন। রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টি শুধু উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে হকারদের জীবিকা, চাঁদাবাজি, স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক বিষয় জড়িত। তবে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সংস্থাটির অবস্থান স্পষ্ট—নগরবাসীর চলাচলের পথ হিসেবে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। উচ্ছেদ অভিযানে বাধা, হামলা কিংবা পুনরায় দখলের চেষ্টা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এখন ডিএনসিসির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো উচ্ছেদ অভিযানকে নিয়মিত ও কার্যকর রাখার পাশাপাশি দখল পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানো, দখলের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এবং হকারদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। প্রশাসকের কঠোর ঘোষণার পর সেই অবস্থান মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেটিই এখন নগরবাসীর আগ্রহের বিষয়।
-20261001051655.jpg)
এন্টি টেররিজম ইউনিটের নতুন নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’
বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে বিদ্যমান এন্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট’ (এসআরইউ)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-৩ শাখা থেকে সম্প্রতি এ বিষয়ে সরকারি মঞ্জুরি দেওয়া হয়েছে। জারি করা স্মারক অনুযায়ী, অর্থ বিভাগ কর্তৃক জি.ও. পৃষ্ঠাঙ্কনের তারিখ থেকেই এই নাম পরিবর্তন কার্যকর হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানভীর-আল-নাসীফ স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, এই নাম পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে অনুমোদিত কোনো পদের পরিবর্তন হবে না। আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আরোপিত শর্তাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় বিধি-বিধান প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি এই আদেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০ আগস্ট, অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখার ৩১ আগস্ট এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক উন্নয়ন ও সমন্বয়-১ শাখার ২ সেপ্টেম্বরের সংশ্লিষ্ট স্মারকের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।

গুজব-অপতথ্য রুখতে তারেক রহমান সরকারের সাহসী পদক্ষেপ
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সাইবার অপরাধও দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গুজব, অপতথ্য, মানহানি, চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ এখন ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারই বহিঃপ্রকাশ। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা খসড়া বিল এর আগে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, সাইবার স্পেসে কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ করতে হবে। সে অনুযায়ী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণের জন্য খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং সাইবার স্পেসের ব্যবহারকারীরা তাঁদের মতামত দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব মতামত সংকলনও করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের আগে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত গ্রহণের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সরকারের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের একটি দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে আইনটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দিতে চায় না, বরং সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত আইন করতে চায়—মতামত গ্রহণের এই প্রক্রিয়ায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, সাইবার সুরক্ষা আইনকে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক হতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ সরকার একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে। খসড়া আইনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য কোনো সংস্থা বা বাহিনীর কাছে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যদি বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে সাইবার স্পেস বা ডিজিটাল কিংবা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করছে কিংবা ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। একইভাবে কোনো তথ্য ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণা কিংবা জাতিগত সহিংসতা সৃষ্টি করে বা করার আশঙ্কা তৈরি করে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ বা নির্দেশনা দেয় অথবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর কিংবা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর হয়, সেসব তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এতে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ের দুজন বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রয়েছে, যাঁরা সরকার মনোনীত হবেন। সাইবার অপরাধের পরিবর্তিত ধরনও প্রস্তাবিত আইনে গুরুত্ব পেয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশ, মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার মতো অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্পাদিত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কোনো তথ্য ব্যবহার করে কাউকে হেয় বা মানহানি করা হলেও তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ছাড়া যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু নিপীড়ন, সেক্সটর্শন, মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা বুলিংয়ের ক্ষেত্রে তথ্য, অডিও, ভিডিও, গ্রাফিকস ও স্থিরচিত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টকে শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। নতুন ধারা যুক্ত করে আইনটি আরও কার্যকর ও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুজব, অপতথ্য, হেয় প্রতিপন্ন এবং মানহানিকর তথ্য—এসব বিষয়কে অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় এনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির বিধান করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশোধিত আইনে নতুন ২৬/ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব বা অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গুজব বলতে এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝাবে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে অথবা এমন অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করে। সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো ব্যক্তির মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য, অডিও, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা এআই দিয়ে নির্মিত কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ অপরাধে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানি বা হেয় প্রতিপন্ন করে কোনো কনটেন্ট প্রচার করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মানহানির ব্যাখ্যায় দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিধানগুলো যুক্ত হলে সাইবার অপরাধের শিকার সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সাইবার অপরাধকে শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে নাগরিকের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এখন শুধু কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতির কারণ নয়; এর প্রভাব পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে এসব প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে অন্যকে নোংরা, কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতা বাড়ছে। এক শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন ব্যক্তির চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল এবং চাঁদাবাজিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ এখন নৈরাজ্য ও অস্থিরতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর ব্যবহার প্রতিরোধে নানা ধরনের আইন ও বিধিবিধান করেছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সাইবার অপরাধের ধরন ও পরিধি বিবেচনায় কার্যকর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস হলেও বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, চরিত্রহনন, অনলাইন হয়রানি ও সাইবার চাঁদাবাজির মতো অপরাধ প্রতিরোধে আরও সুস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিদেশে বসেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও উদ্যোক্তাদের টার্গেট করছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক অনলাইন আক্রমণ। অসত্য ও ভিত্তিহীন বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়িয়ে তাঁদের সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একপর্যায়ে অর্থ আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যবসায়িক সুনাম রক্ষার জন্য এসব সাইবার চাঁদাবাজের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন না, তাঁদেরও নানা ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাইবার বুলিংয়ের কারণে অনেক মানুষ সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের অনলাইন হয়রানি, অপমান, হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঘটনা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব হয়রানির পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ফলে সাইবার বুলিংকে নিছক অনলাইন কৌতুক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসী বা মাস্তান ব্যবহার করার ঘটনা দেখা যেত। এখন প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সেই প্রবণতার নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কাউকে হেয় করা, ভয় দেখানো, চরিত্রহনন করা কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নারীদের ক্ষেত্রেও অনলাইন হয়রানি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নারী কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের মানুষই নয়, সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রদায়ও। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঘটনাও দেখা যায়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও অপতথ্য প্রচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ, বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তবে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ১৯ নম্বর ধারায় প্রত্যেক মানুষের মতামত রাখা এবং তা প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে এবং কী বলবে—সে বিষয়ে তার মৌলিক অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। অন্যের সুনাম, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা কিংবা সমাজের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে আইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে। অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করে অন্যের অধিকার ও নিরাপত্তা ধ্বংস করার সুযোগও থাকা উচিত নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিশ্বকে দেখিয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা ও ঘৃণার বিস্তার কতটা ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির কারণে সেই প্রচারণা আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে কোনো অপপ্রচার লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগত। এখন একটি পোস্ট, ভিডিও কিংবা গ্রাফিকস কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা অপতথ্যের ক্ষতি অনেক বেশি দ্রুত ও ব্যাপক হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের আইন ও নীতিমালা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ সরকার যদি একদিকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং অন্যদিকে আইনটির অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আইনটি চূড়ান্ত করার আগে বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের মতামত গ্রহণের উদ্যোগ সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি স্পষ্ট করে। জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হলে আইনটির গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়াও প্রয়োজন। কারণ একটি ভালো সাইবার আইন শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নারী, শিশু এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যে সাইবার অপরাধকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং আইন সংশোধনের আগে বিভিন্ন মহলের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা সরকারের সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগকে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করা। সাইবারজগতে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনও পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। তাই সাইবার সন্ত্রাস, গুজব, অপতথ্য, বুলিং, মানহানি ও অনলাইন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন প্রণয়নই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য। এই বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ শুধু একটি আইন পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারের সদিচ্ছা, অংশীজনের মতামত এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন সম্ভব হলে সাইবার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

জাতিসংঘ সফরের বিস্তারিত জানাতে আজ সংবাদ সম্মেলন করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং তার নিউইয়র্ক সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলন করতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বিকেল সাড়ে ৩টায় তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘করবী হলে’ এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব হাসান শিপলু এই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ, নিউইয়র্ক সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি এবং বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরা হবে বলে জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও কার্যালয়ের মুখপাত্র সালেহ শিবলী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন। সফর নিয়ে আগে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের তথ্য জানানো হয়েছিল।

ঢাকার কবরস্থানে জায়গা কম, কবর সংরক্ষণে বাড়ছে অর্থের চাপ
মানুষের জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অনুভূতিগুলোর একটি হলো প্রিয় স্বজনের সান্নিধ্য। সেই স্বজন যখন চিরদিনের জন্য চলে যান, তখন তাঁর শূন্যতা কতটা গভীর, কতটা অসহনীয়—যে হারায়, সে ছাড়া আর কেউ তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। প্রিয় মানুষটির মুখটি আর দেখা যাবে না, কণ্ঠটি আর শোনা যাবে না, ফিরে আসবে না সেই পরিচিত ডাক। তখন তাঁর স্মৃতি আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে চায় স্বজনেরা। আর তাই মৃত্যুর পর প্রিয় মানুষটিকে কোথায় শেষ ঠিকানায় শায়িত করা হবে, সেটিও পরিবারের কাছে হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগের বিষয়। কোথায় দাফন করলে স্বজনেরা সহজে যেতে পারবেন, কবরটি কত দিন অক্ষত থাকবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেখানে গিয়ে প্রিয় মানুষটির জন্য দোয়া করতে পারবে কি না—এসব নিয়ে চলে চুলচেরা হিসাব-নিকাশ। রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের বড় একটি অংশ চান, প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটিও থাকুক এই শহরেই। কারণ এখানেই তাঁদের জীবন, কর্ম, সন্তান-স্বজন, পরিচিতজন। গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলে হয়তো নিয়মিত কবর জিয়ারত করা সম্ভব হবে না। তাই কবরের জায়গা কত দিন থাকবে, কত টাকা লাগবে—এসব জেনেও অনেকে ঢাকাতেই দাফন করেন স্বজনকে। অথচ তাঁরা জানেন, কয়েক বছর পর হয়তো সেই কবরের মাটি সমান করে সেখানে শায়িত করা হবে সম্পূর্ণ অচেনা আরেকজনকে। জীবিত মানুষের আবাসন সংকটের কথা রাজধানী ঢাকায় প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যে মৃত মানুষের শেষ ঠিকানার সংকটও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, সে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে সরকারি কবরস্থানের মোট জমি মাত্র ২৫৩ একর। ফলে মৃত্যুর পরও মানুষের শেষ ঠিকানাটুকু নিশ্চিত নয়। আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কবর সংরক্ষণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অর্থের আরেক বাস্তবতা। দাফনের পর কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে কোথাও পদে পদে দিতে হয় টাকা, কোথাও মাসে মাসে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অর্থ। আর দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে গুনতে হয় লাখ থেকে কোটি টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ বছরের জন্য একটি সাড়ে তিন হাত জায়গা সংরক্ষণে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা—যে অর্থে রাজধানীর গুলশান-ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কিংবা জমি কেনার কথাও ভাবা যায়। একদিকে শোকাহত স্বজনের চোখে প্রিয় মানুষটির শেষ ঠিকানাটি অমূল্য; অন্যদিকে সেই শেষ ঠিকানার মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে টাকার অঙ্কে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুর পর মানুষের শেষ আশ্রয়ও কি সামর্থ্যের মাপকাঠিতে নির্ধারিত হবে? প্রিয় স্বজনের কবরটুকু ধরে রাখার অধিকার কি শুধু অর্থবান মানুষের জন্যই? রাজধানী ঢাকায় জীবিত মানুষের আবাসন সংকটের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংকট বাড়ছে মৃত মানুষের শেষ ঠিকানা নিয়েও। প্রায় তিন কোটি মানুষের এই নগরীতে সরকারি কবরস্থান মাত্র ১৩টি। এসব কবরস্থানের মোট জমির পরিমাণ ২৫৩ একর। সব মিলিয়ে দাফন সক্ষমতা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জনের। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় কবরস্থানের জমি ১৯২ একর, আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় মাত্র ৬১ একর। জনসংখ্যার তুলনায় কবরস্থানের এই অপ্রতুলতা রাজধানীর শেষবিদায়ের ব্যবস্থাপনাকে ক্রমেই জটিল করে তুলছে। জায়গার সংকটে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার এখন অনেক কবরস্থানের নিয়মিত বাস্তবতা। কোথাও দুই বছর পর একই স্থানে নতুন মরদেহ দাফন করা হচ্ছে, কোথাও স্বজনেরা কবরের চিহ্ন ধরে রাখতে মাসে মাসে টাকা দিচ্ছেন। আবার সামর্থ্যবানদের জন্য কোনো কোনো কবর ১৫ বা ২৫ বছর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও এর জন্য গুনতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা। ফলে জীবনের শেষ ঠিকানাতেও তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বৈষম্য—অর্থ থাকলে কবর দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুযোগ, আর সামর্থ্য না থাকলে স্বজনের কবরের অস্তিত্বই অল্প সময়ের মধ্যে মুছে যাওয়ার আশঙ্কা। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার সরকারি ১৩টি কবরস্থানে মোট জমি ২৫৩ একর। এর মধ্যে ডিএনসিসির ১৯২ একর এবং ডিএসসিসির ৬১ একর। এসব কবরস্থানে সম্মিলিত দাফন সক্ষমতা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জন। ঢাকার বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় এই জায়গা যে অত্যন্ত সীমিত, তা সহজেই বোঝা যায়। প্রতিদিন নগরীতে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। অথচ নতুন কবরের জন্য জমির পরিমাণ বাড়ছে না একই অনুপাতে। ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহারই হয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত একমাত্র ব্যবস্থা। কিন্তু এই বাস্তবতা তৈরি করছে স্বজনদের জন্য নতুন সংকট। প্রিয়জনকে দাফনের পর তাঁরা জানেন, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে সেই কবর আর আগের অবস্থায় নাও থাকতে পারে। ফলে শোকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনিশ্চয়তা—কত দিন থাকবে প্রিয় মানুষের শেষ ঠিকানা? রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জায়গা ব্যবহারের বিধান রয়েছে। জায়গার সংকটের কারণে নির্ধারিত সময় শেষ হলে পুরনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফন করা হয়। বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে এই সংকট প্রকট। সেখানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে এবং নতুন দাফনের জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে সাধারণ কবর দুই বছর পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার সেই আবেগময় দৃশ্য—‘এই খানে তোর দাদির কবর’—রাজধানীর অধিকাংশ সাধারণ পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ একটি কবরের সঙ্গে শুধু একজন মৃত মানুষের স্মৃতি নয়, জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ইতিহাস, সম্পর্ক ও আবেগ। কিন্তু জায়গার সংকট সেই স্মৃতিকে স্থায়ী করার সুযোগ ক্রমেই সীমিত করছে। অর্থ থাকলে অবশ্য কবর দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করার সুযোগ রয়েছে। ডিএনসিসির কবরস্থান নীতিমালা অনুযায়ী, বনানী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে দিতে হয় ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে এই হার যথাক্রমে ৭৫ লাখ ও ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ১৫ বছরের জন্য ৫০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ টাকা। উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে একই মেয়াদের জন্য দিতে হয় ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির চেয়ে ব্যয় আরও বেশি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে মোট ব্যয় সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ একজন স্বজনের কবর দীর্ঘ সময় ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও সেটি সবার জন্য সমানভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কবরস্থানের জায়গা সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দাফন ও কবর সংরক্ষণকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম মারা গেলে তাঁকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের একজন স্বজনের অভিযোগ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দাফন ফি ছিল ১ হাজার টাকা। কিন্তু দাফন সম্পন্ন করতে তাঁদের মোটামুটি ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর বাইরে কাঠের নামফলকের জন্য ৩০০ টাকা, কবর সাজানো ও সাময়িক সংরক্ষণের নামে এককালীন আরও ১ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এরপর কবরটি অক্ষত রাখার জন্য মাসে ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। পরিবারটির আশঙ্কা ছিল, মাসিক টাকা দেওয়া বন্ধ করলে কবরের মাটি সমান করে সেখানে অন্য মরদেহ দাফন করা হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষকে দাফনের পরও স্বজনদের আর্থিক দায় শেষ হচ্ছে না—কবরের চিহ্ন ধরে রাখতেও তাঁদের নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কবরস্থানগুলোতে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও খাটোলি থাকলেও কোনো কোনো কবরস্থানে এর বাইরে বিপুলসংখ্যক অনানুষ্ঠানিক কর্মী সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের ‘সহায়ক কর্মী’ পরিচয় দিয়ে এসব ব্যক্তি দাফন, কবর সাজানো, বাঁশের বেড়া দেওয়া, ঘাস লাগানো, পানি দেওয়া ও নিয়মিত পরিচর্যার কাজ করেন। বাঁশের বেড়া দিতে ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, কবর সাজানো বা ঘাস লাগাতে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং নিয়মিত পানি দেওয়া ও দেখভালের জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ নেওয়ার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রায়েরবাজার কবরস্থানে দীর্ঘদিন কাজ করা এক কর্মী স্বজনদের কাছ থেকে এ ধরনের অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এ আয়ের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মীদের কাছেও যায়। তবে এ অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ‘কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’-এ সাধারণ এলাকার কবরের ওপর বাঁশ, ইট, লোহার গ্রিল বা অন্য কোনো উপায়ে স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি কিংবা বেড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ বাস্তবে কবর ঘিরে বাঁশের বেড়া, সাজসজ্জা ও পরিচর্যার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—নীতিমালায় যদি এসব কাজের অনুমোদন না থাকে, তাহলে কবরস্থানের ভেতরে কীভাবে এসব কার্যক্রম চলছে? কারা এসব অর্থ নিচ্ছে? আর স্বজনেরা অভিযোগ করার পরও কেন তা বন্ধ হচ্ছে না? জায়গার সংকটের কারণে সংরক্ষিত কবরেও পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফনের নজির রয়েছে। কোনো কোনো কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে। তবে পুনর্দাফনের সুযোগও সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। নীতিমালা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির ছেলে-মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা এবং ভাই-বোনের মধ্যে এ সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থাও দেখিয়ে দেয়, রাজধানীর কবরস্থানগুলোতে জায়গার সংকট কতটা গভীর হয়ে উঠেছে। কবরের জায়গার সংকট ও সংরক্ষণ ব্যয়ের বর্তমান চিত্র আরও স্পষ্ট হয় পুরনো নথির সঙ্গে তুলনা করলে। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে বনানী ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জায়গা পাওয়া যেত ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায়। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কবরের জায়গা কেনা বন্ধ রাখা হয়। এরপর ২০০৮ সাল থেকে মেয়াদভিত্তিক কবর সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়। ২০২৩ সালে সংরক্ষণ ফি বাড়ানোর আগে বনানীতে ১৫ বছরের জন্য সর্বোচ্চ ফি ছিল ২৪ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৪৫ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। ডিএনসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান বলেছেন, সাধারণভাবে কবর দেওয়ার খরচ বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণে উচ্চ ফি নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করা, যাতে সবাই কবর সংরক্ষণ করতে চাইলে ঢাকায় কবরের জায়গার সংকট আরও বাড়ে। সিটি করপোরেশনের এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট যে, কবরস্থানের জায়গা সংকটই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সীমিত রাখার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একদিকে জায়গার সংকট, অন্যদিকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ—এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়সংগত ও মানবিক সমাধান কোথায়? ঢাকার কবরস্থান ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই। একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষ প্রিয়জনের কবরটি কয়েক বছর ধরে রাখতে মাসে কয়েকশ টাকা করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে সামর্থ্যবান কেউ একই কবর ১৫ বা ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে লাখ কিংবা কোটি টাকা ব্যয় করতে পারছেন। ফলে একই শহরে মৃত্যুর পরও অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানুষের শেষ ঠিকানার স্থায়িত্বে প্রভাব ফেলছে—এমন অভিযোগ ও বাস্তবতা সামনে আসছে। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবু রায়হানের অভিজ্ঞতাও এর উদাহরণ। তাঁর খালু আব্দুল আলী মারা যাওয়ার পর ঢাকায় দাফনের ইচ্ছা থাকলেও কবর সংরক্ষণের বিপুল ব্যয় বহন করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। রাজধানীতে কবরস্থানের জমি ২৫৩ একর, আর জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি—এই বৈপরীত্যই পুরো সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন নতুন মরদেহের জন্য জায়গা প্রয়োজন, কিন্তু নতুন কবরস্থানের জমি সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে বিপুল অর্থ নির্ধারণ করা হচ্ছে। আর এর বাইরে কবর পরিচর্যা, বেড়া, নামফলক ও অন্যান্য কাজের নামে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অর্থাৎ কবরস্থানের জায়গা সংকট শুধু জমির সংকট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনিয়ম এবং স্বজনদের আবেগকে ঘিরে নানা ধরনের আর্থিক চাপ। ঢাকার মতো দ্রুত সম্প্রসারিত মহানগরে কবরস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কবরস্থান স্থাপন, বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর আধুনিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দাফন ও সংরক্ষণ ফি সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কবরস্থানে অননুমোদিত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা জরুরি। কবর মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা। সেখানে অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য যেন প্রিয়জনের কবরটুকু ধরে রাখাই অসম্ভব না হয়ে পড়ে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাজধানীর ১৩টি সরকারি কবরস্থানের ২৫৩ একর জমি দিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষের শেষ ঠিকানার চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই শুধু পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার কিংবা সংরক্ষণ ফি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়ার বদলে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, স্বচ্ছ ও মানবিক কবরস্থান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। কারণ জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষ অর্থ, পরিচয় কিংবা ক্ষমতা নিয়ে যায় না। থেকে যায় শুধু একটি নাম, কিছু স্মৃতি এবং কয়েক হাত মাটির একটি কবর। সেই শেষ ঠিকানাটুকু যেন কারও কাছে ব্যবসার সুযোগ আর কারও কাছে অসহায়তার কারণ না হয়—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

কৃষকরাই দেশের আসল ও শ্রেষ্ঠ মানুষ: রাষ্ট্রপতি, চালু হবে ‘রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার’
কৃষকরাই দেশের আসল ও শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তারা দেশ গড়ার অন্যতম যোদ্ধা বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কৃষকদের সম্মানিত ও উৎসাহিত করতে কৃষিক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। রোববার দুপুরে বঙ্গভবনে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কুল ময়েজের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন। বিষয়টি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মো. আব্দুল জলিল, মো. হাসান আলী, মোছা. বেলী বেগম, মো. আবু তালেব জোয়াদ্দার, মো. হাফিজুর রহমান মুকুল, তোফাজ্জল হোসাইন ও শওকত আলম। সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি দল-মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে কৃষকদের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন এবং কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি কৃষি ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি এবং কৃষকদের দাবিদাওয়াকে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ দেওয়ারও আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের সবচেয়ে ইতিবাচক খাতগুলোর একটি হলো কৃষি। কৃষকের শ্রম, ঘাম ও পরিশ্রমের পাশাপাশি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দেশে ফসল উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। তার মতে, কৃষকেরা দুর্নীতি করেন না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আলোচনায় উঠে আসে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার বিষয়টিও। রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃষিপণ্য ও শস্য যেন সহজেই ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে এবং কৃষক উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য পান, সে জন্য কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের আরও সচেতন, উদ্যোগী ও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে একটি নতুন স্কিম চালু করা হয়েছে, যার আওতায় ইতিমধ্যে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করেছে বলেও জানান তিনি। সহজ শর্তে কম সুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থাসহ কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগের সুফল শিগগিরই কৃষকরা পাবেন। সাক্ষাৎকালে কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বিনা সুদে ঋণ সুবিধা, কৃষক দিবস পালন ও জাতীয় পুরস্কার প্রদান, শস্যবীমা চালু, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক কমিটিতে কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব, বজ্রপাত ও সাপের কামড় থেকে সুরক্ষা এবং কৃষি উপকরণ সুলভে সরবরাহসহ বিভিন্ন দাবি রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে উৎপাদিত ফলমূল ও কৃষিজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এসব পণ্য রপ্তানিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও এগিয়ে আসতে কৃষক সমিতির সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে শিল্প-কারখানা স্থাপন, আধুনিক হিমাগার নির্মাণ এবং খামারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কৃষিঋণের সুদ, বিশেষ করে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের সুদ কমানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রপতি। সাক্ষাৎকালে কৃষক সমিতির সভাপতি ঈশ্বরদীতে কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য ৭০ বছরের বেশি বয়সী কৃষকদের সংবর্ধনা দেওয়ার একটি উদ্যোগের কথা রাষ্ট্রপতিকে জানান। পাশাপাশি আধুনিক কৃষিপণ্য প্রদর্শন ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে একটি মেলা আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও অবহিত করেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলে সেই মেলায় উপস্থিত থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।

ঢাকায় কবরের জায়গা ‘দুর্লভ সম্পদ’, ২৫ বছরে গুনতে হয় কোটি টাকা
ঢাকায় একটি বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা সামান্য এক টুকরো জমির জন্য যেমন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও অনেক সময় যথেষ্ট হয় না, তেমনি রাজধানীতে মৃত্যুর পর একটি কবরের জায়গা ধরে রাখাও এখন অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ দাফনের নিবন্ধন ফি যেখানে মাত্র ৫০০ টাকা, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য দিতে হচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকা। বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য প্রায় ২০ বর্গফুটের একটি কবর সংরক্ষণে খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। জমির স্বল্পতা, ক্রমবর্ধমান দাফনের চাপ এবং নগরায়ণের বিস্তারের কারণে ঢাকার কবরস্থানগুলোতে জায়গার সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। রাজধানীতে জীবিত মানুষের আবাসনের জন্য জমির মূল্য যেমন বাড়ছে, মৃত্যুর পর কয়েক হাত মাটির জায়গার মূল্যও তেমনি হয়ে উঠছে বিরল সম্পদের মতো। কোথাও সাধারণ দাফন কয়েকশ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে সম্পন্ন হলেও কবর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে গেলে হিসাব বদলে যাচ্ছে। কোথাও কয়েক লাখ, কোথাও কয়েক দশ লাখ, আবার বনানীর মতো এলাকায় সেই ব্যয় পৌঁছেছে কোটি টাকার ঘরে। ঢাকার অভিজাত বনানী এলাকার কবরস্থান এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণগুলোর একটি। সুউচ্চ ভবন, দামি আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার মাঝখানে থাকা এই কবরস্থানে একটি কবর দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা অনেক পরিবারের জন্য কল্পনাতীত। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সারিতে দাফনের পর একটি কবর ১৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা। ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে দিতে হয় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। একটি কবরের আয়তন প্রায় ৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থ—অর্থাৎ ২০ বর্গফুটের কিছু বেশি। একই শহরে যেখানে একটি মাঝারি বা বড় ফ্ল্যাট কেনার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে একজন মানুষের মৃত্যুর পর কয়েক হাত মাটির জায়গা দীর্ঘদিন ধরে রাখার খরচও প্রায় একই মাত্রায় পৌঁছে গেছে। বনানী কবরস্থানে এমন অনেক মানুষ আসেন, যারা স্বজনের কবর সংরক্ষণ অথবা ভবিষ্যতের জন্য নিজের কবরের জায়গা সম্পর্কে খোঁজ নেন। কিন্তু শুধু অর্থ থাকলেই যে জায়গা পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ এখানে অর্থের পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছে জমির সংকট। বনানী কবরস্থানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষিত কবরের পাশাপাশি সাধারণ দাফনের জন্যও নির্ধারিত জায়গা রয়েছে। সাধারণ কবরের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে কবর খনন, বাঁশ, চাটাইসহ নির্ধারিত অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়। সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর। এই সময় পার হওয়ার পর জায়গাটি পুনরায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। অন্যদিকে সংরক্ষিত কবরের ক্ষেত্রে পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্যদের পুনরায় দাফনের সুযোগ থাকে। সেখানে প্রতিবার পুনঃদাফনের জন্য দিতে হয় ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, বনানীতে দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের ফি বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ জমির সীমাবদ্ধতা। সাধারণ কবরকে ব্যাপকভাবে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করা হলে নতুন মরদেহ দাফনের জন্য জায়গা দ্রুত কমে যাবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কবরের জায়গার সংকট শুধু বনানীতে নয়; ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অন্যান্য কবরস্থানেও দাফনের চাপ রয়েছে। ডিএনসিসির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় বর্তমানে সাতটি নিবন্ধিত পাবলিক কবরস্থান রয়েছে। এগুলো হলো—বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থান এবং উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর ও চামুরখান কবরস্থান। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ৬৩ দশমিক ৫৪০ একর জমির ওপর বিস্তৃত। ১৯৮৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে ৬৩ হাজার ৯১৭টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এখানে সাধারণ দাফনের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। বাঁশ, চাটাই ও কবর খননসহ নির্ধারিত অন্যান্য খরচ যোগ হলে মোট ব্যয় হয় আরও ১ হাজার ৪৫৬ টাকা। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যয় অনেক বেশি। ১৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে ২০ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা দিতে হয়। সাধারণ এলাকার একটি কবর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে চাইলে এই ব্যয় বেড়ে ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। রায়েরবাজার কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ১০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়। বনানী কবরস্থানের মোহরার মো. হারুন অর রশিদ জানান, ২০০৭ সালের আগে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করা কবরগুলোর মালিকানা বর্তমানে সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। এসব জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং দলিলের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এসব কবরের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন মূলত পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে। দাফনের জন্য মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি প্রয়োজন হয়। দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিতে হয় বলে জানান তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় মুসলিমদের দাফনের জন্য তালিকাভুক্ত কবরস্থান রয়েছে পাঁচটি। এগুলো হলো—আজিমপুর, জুরাইন, ধলপুর ব্রাহ্মণচিরণ, মুরাদপুর ও খিলগাঁও কবরস্থান। এসব কবরস্থানেও সাধারণ দাফনের নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। তবে কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে বড়দের দাফনে প্রায় ১ হাজার ৫৮০ টাকা, মাঝারি কবরের ক্ষেত্রে ১ হাজার ২১০ টাকা এবং শিশুর ক্ষেত্রে ৯৫৫ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যয় অনেক বেশি। আজিমপুর কবরস্থানে ১০ বছরের জন্য কবর লিজের ফি ৫ লাখ টাকা। ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা দিতে হয়। আজিমপুরে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মরদেহ দাফন করা হয়। কবরস্থানের আয়তন একই থাকলেও দাফনের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর সাধারণ কবর পুনর্ব্যবহার করা ছাড়া কর্তৃপক্ষের সামনে খুব বেশি বিকল্প থাকছে না। জায়গার স্বল্পতার কারণে ঢাকার অনেক কবরস্থানেই নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হয়। সাধারণ কবরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে ওই জায়গায় নতুন মরদেহ দাফন করা হয়। দক্ষিণ সিটির কয়েকটি কবরস্থানে সাধারণ কবর প্রায় এক বছর পর্যন্ত রাখা হয়। এই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বজনদের আবেগও। প্রিয়জনের কবরের পাশে দীর্ঘদিন বসে থাকা, নিয়মিত ফুল দেওয়া কিংবা কবরটি বছরের পর বছর আগলে রাখার ইচ্ছা থাকলেও নগরের জমির সীমাবদ্ধতা সেই সুযোগ সব পরিবারের জন্য রাখছে না। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোতে সাধারণ এলাকায় দাফন করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর ১০ বছর বিনা মূল্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। রায়েরবাজারে তাদের জন্য আজীবন কবর সংরক্ষণের সুবিধার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত কবর ছাড়া অন্যান্য কবর সাধারণ কবর হিসেবে বিবেচিত হয়। মেয়াদি সংরক্ষিত কবরের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্বজনরা তা নবায়ন বা মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে কবরটি সাধারণ কবর হিসেবে গণ্য হবে। পরবর্তী সময়ে সেখানে অন্য মরদেহ দাফন করা যাবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কবরস্থান ব্যবস্থাপনার তথ্য বিশ্লেষণ করলে জমির সংকটের চিত্র আরও পরিষ্কার হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১৯২ একর। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৫৯ একর। দাফনের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও কবরস্থানের জমি একই হারে বাড়ছে না। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নতুন কবরস্থান তৈরির জন্য জমি নির্বাচনের কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীতে নতুন করে বড় আকারের জমি পাওয়া নিজেই একটি কঠিন কাজ। নগরের পরিকল্পনা বলতে সাধারণত আবাসিক এলাকা, সড়ক, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, পার্ক, বাজার কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনার কথা সামনে আসে। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় কবরস্থানও যে নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মানুষের জন্ম, বসবাস ও মৃত্যুর প্রয়োজন—সবকিছুকেই একটি পূর্ণাঙ্গ নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, কবরস্থান মানুষের আবেগ, সামাজিক স্মৃতি ও পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের জন্য বিপুল অর্থ নির্ধারণ করা রাজধানীতে কবরস্থানের সংকটের গভীরতার একটি ইঙ্গিত। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার অধিকাংশ মানুষ এখনো তাদের নিজ নিজ গ্রামের কবরস্থানে স্বজনদের দাফন করেন। তবে শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকায় দাফনের প্রবণতা ভবিষ্যতে বাড়তে পারে। তিনি জানান, বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালায় প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য এক একর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সে হিসাবে ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে কবরস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কয়েকশ একর হতে পারে। এ ছাড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট আকারের কবরস্থান রাখার সুপারিশ রয়েছে। ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। নতুন সড়ক, ভবন ও অবকাঠামোর জন্য জমির চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে নির্ধারিত জমির পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে একই শহরে দাফনের সময় কয়েকশ বা হাজার টাকার মধ্যে কাজ শেষ হলেও কবর দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে গেলে ব্যয় পৌঁছে যাচ্ছে লাখ থেকে কোটি টাকায়। বনানীতে ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে, যা রাজধানীতে কবরস্থানের জমির মূল্য ও সংকটের একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। একদিকে জীবিত মানুষের জন্য বাসস্থানের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠছে। নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার, মেয়াদি কবর সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের বিপুল ফি—সব মিলিয়ে ঢাকার কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় জমির সংকট এখন নগর বাস্তবতারই একটি অংশ। কয়েক হাত মাটিই মানুষের শেষ আশ্রয়। অথচ দ্রুত সম্প্রসারিত এই নগরে সেই কয়েক হাত জায়গা নিশ্চিত করতেও এখন অর্থ, জমি এবং নগর পরিকল্পনার হিসাব একসঙ্গে সামনে আসছে।

জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ইকে-৫৮২ ফ্লাইটটি সকাল ৮টা ২১ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি একের পর এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বৈঠক শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায় নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্কে চার দিনের কর্মসূচিতে মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী, যার মধ্যে ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এই তথ্য জানান। এসব বৈঠকে গুরুত্ব পায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য খাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তির বিভিন্ন বিষয়। মাহদী আমিন আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী ইউএনজিএ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, অধিবেশনের সাইডলাইনে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। এ ছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও পৃথকভাবে বৈঠক করেন তিনি। সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নেন, যার মধ্যে চারটি অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যও রাখেন। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্স, ফার্স্ট স্পাউসেস’ ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি বিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান।

শিগগিরই কাটবে জ্বালানি সংকট, আশ্বাস জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর
শিগগিরই দেশের জ্বালানি সংকট কেটে যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, সামনে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব মন্তব্য করেন তিনি। মন্ত্রী জানান, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে সরকারকে কিছুটা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি কেনা সম্ভব হলেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তা দেশে আনা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, এখন সঠিকভাবে জ্বালানি আসছে দেশে। যে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছিল, তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দেখা গেছে। তবে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের মানুষকে যে কষ্ট পোহাতে হয়েছে, সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আরও বলেন, জনগণ আস্থা রেখে সরকারকে ভোট দিয়েছে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ ও দুর্ঘটনাজনিত কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে এখন জ্বালানি আমদানি সম্ভব হয়েছে এবং সরবরাহের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচিও ঠিক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই চলবে বলে প্রত্যাশা প্রকাশ করেন তিনি। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার বিভিন্ন বিকল্প উৎস খুঁজে বের করেছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, তুলনামূলক বেশি দাম দিয়েই হলেও গ্যাস আমদানি করা হয়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাই একটি দল হিসেবে কাজ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় দুবাই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখানে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির পর রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশে ফের যাত্রা শুরু করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে গত ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার প্রথম অংশগ্রহণ।

চার সাংবাদিকের পরিবারকে এবিজি ফাউন্ডেশনের ২০ লাখ টাকা সহায়তা
সাংবাদিকরা মানুষের কথা তুলে ধরতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্বে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। ব্যক্তিগত সংকট কিংবা অসুস্থতাও অনেক সময় তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তবে সংকটের সময়ে সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেই মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে সাংবাদিকদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ (এবিজি) ফাউন্ডেশন। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সচিবালয় বিটের দুই অসুস্থ সাংবাদিকের চিকিৎসার জন্য এবং প্রয়াত দুই সাংবাদিকের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছে এবিজি ফাউন্ডেশন। শুক্রবার রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বিয়াম মাল্টিপারপাস হলে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ)-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় এ সহায়তার চেক হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে চার সাংবাদিকের প্রত্যেকের জন্য পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ২০ লাখ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রয়াত সাংবাদিক হারুন অর রশিদ তালুকদার ও হুমায়ুন কবির খোকনের পরিবারের জন্য পাঁচ লাখ টাকা করে এবং অসুস্থ সাংবাদিক রাকিব উদ্দিন ও আমানুর রহমানের চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে এবিজি ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিত্ব করেন মো. ইমরুল হাসান, ডিএমডি অ্যান্ড হেড অব এএন্ডএফ, ইডাব্লিউপিডি এবং বিসিডিএল ও পরিচালক, বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি; এম. জেড. হোসেন আরজু, হেড অব ডিভিশন (আর অ্যান্ড ডি), এবিজি এবং মো. শাজেদুল করিম, জেনারেল ম্যানেজার, জিওলজি অ্যান্ড মাইনিং, এবিজি ফাউন্ডেশন। দৈনিক ইনকিলাবের প্রয়াত সাংবাদিক হারুন অর রশিদ তালুকদারের পরিবারের পক্ষে পাঁচ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেন তার ছেলে মো. তৌহিদ হারুন। তিনি জানান, তার বাবা দীর্ঘদিন কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। বাবার অসুস্থতার সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তৌহিদ হারুন বলেন, ‘আমার বাবা দীর্ঘদিন ধরে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থ ছিলেন। আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশন। তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আশা করবো তারা এইভাবে সাংবাদিকদের পাশে থাকবেন।’ দৈনিক আমাদের সময়ের প্রধান প্রতিবেদক ও প্রয়াত সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকনের পরিবারের পক্ষে চেক গ্রহণ করেন তার স্ত্রী শারমিন সুলতানা রিনা। তিনি বলেন, কোভিডে স্বামীর মৃত্যুর সময়ও বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আবারও এই আর্থিক সহায়তা তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সময়ে এসেছে। শারমিন সুলতানা রিনা বলেন, ‘আমার স্বামী কোভিডে মারা গেছেন। সেই সময়েও বসুন্ধরা গ্রুপ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আজকে আবার যখন আমাকে এই চেকটি দিলেন, এটা আমাদের জন্য ভীষণ প্রয়োজন ছিল। আমাদের জীবনটা এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। এই মুহূর্তে এটা আমাদের জন্য বিরাট পাওয়া।’ দৈনিক সংবাদের অসুস্থ সাংবাদিক রাকিব উদ্দিনের পক্ষে পাঁচ লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেন তার স্ত্রী নাসরিন জাহান। তিনি স্বামীর চিকিৎসায় সহায়তার জন্য এবিজি ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নাসরিন জাহান বলেন, ‘এবিজি কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার অসুস্থ স্বামীকে সহযোগিতা করার জন্য।’ এ ছাড়া দৈনিক নয়া দিগন্তের সাংবাদিক আমানুর রহমানের চিকিৎসার জন্যও পাঁচ লাখ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়। নিজের হাতে চেক গ্রহণ করে এবিজি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি। আমানুর রহমান বলেন, ‘আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপ ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আল্লাহ যেন তাদের এই প্রয়াস ও ডেডিকেশনকে কবুল করেন।’ তিনি অসুস্থ সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সাংবাদিক পরিবারের পক্ষ থেকে ফাউন্ডেশনের প্রতি ধন্যবাদ জানান। ভবিষ্যতেও সাংবাদিকদের পাশে এবিজি ফাউন্ডেশনকে পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। অনুষ্ঠানে এবিজির পক্ষ থেকে মো. ইমরুল হাসান বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের বাস্তব চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তাদের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও স্বচ্ছ সমাজ নির্মাণের প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু মানুষের কল্যাণ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে লেখার সময় একজন সাংবাদিক নিজেই যদি আর্থিক সংকটে থাকেন, তাহলে তার কাজেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকরা স্বচ্ছ সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন। তাদের মাধ্যমে আমরা একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেই স্বপ্নের কথা লিখতে গিয়ে যখন কলম চালানো মানুষটি আর্থিক অনটনের মধ্যে থাকেন, তখন অনেক সময় মনের ভাবটা সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরতে পারেন না। এ জন্য সাংবাদিকদের আর্থিক সচ্ছলতা প্রয়োজন।’ ইমরুল হাসান আরও বলেন, এবিজি সবসময় সাংবাদিকদের পাশে রয়েছে। পাশাপাশি এবিজি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নানা ধরনের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের পেছনে এবিজির চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এদিকে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমূলক কাজকে উৎসাহিত করতে বিএসআরএফ ও এবিজি ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের কথাও অনুষ্ঠানে জানানো হয়। সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও ইতিবাচক প্রতিবেদনকে উৎসাহিত করাই হবে এ পুরস্কারের মূল উদ্দেশ্য। প্রস্তাবিত এ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে স্পন্সর হিসেবে থাকবে এবিজি ফাউন্ডেশন। এবিজি ফাউন্ডেশন সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতি শুক্রবার এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও আর্থিক সংকটে থাকা মানুষকে সহায়তা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বৃত্তি দেওয়ার কার্যক্রমও পরিচালনা করছে এবিজি ফাউন্ডেশন।

দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী ২২ বিচারপতি, আইনাঙ্গনে আলোচনা
সংবিধান ও দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিচারিক প্রথা অনুসরণ না করে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ২২ জন অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় উচ্চ আদালত ও আইনাঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মেয়াদকালেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের একাংশের মতে, অতিরিক্ত বিচারপতিদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী করা এবং তাঁদের কয়েকজনের কোনো পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় না থাকা—দুই বিষয়ই উচ্চ আদালতের প্রচলিত রীতি ও বিচারিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অনধিক দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে তাঁদের বিচারিক দক্ষতা, মামলার নিষ্পত্তির গতি, রায় লেখার সক্ষমতা এবং আচরণসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁদের কর্মদক্ষতা ও সামগ্রিক বিচারিক কার্যক্রম পর্যালোচনার ভিত্তিতে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের আওতায় স্থায়ী বিচারপতি নিয়োগের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক বর্তমান ও সাবেক বিচারপতির সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে জানা গেছে, অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী করার সুপারিশের ক্ষেত্রে সাধারণত তাঁর লেখা পূর্ণাঙ্গ রায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, অন্তত পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিরা তাঁর বিচারিক দক্ষতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হলে স্থায়ীকরণের সুপারিশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে কোনো বিচারপতির কাজ সন্তোষজনক মনে না হলে তাঁর অতিরিক্ত বিচারপতির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। আবার প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ না হলে স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ার নজিরও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিচারপতি ও আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত বিচারপতির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার এমন দৃষ্টান্ত অতীতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ পান। এর প্রায় এক বছর এক মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ওই ২৩ জনের মধ্যে ২২ জনকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ তাঁদের দুই বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্থায়ী নিয়োগ কার্যকর হয়। অন্যদিকে, ওই সময় স্থায়ী নিয়োগ না পাওয়া একজন অতিরিক্ত বিচারপতির মেয়াদ প্রাথমিকভাবে বাড়ানো হয়। পরে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকেও স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক বছর এক মাসের মাথায় স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ২২ বিচারপতির মধ্যে এমন বিচারপতিও রয়েছেন, যাঁরা স্থায়ীকরণের আগে কোনো পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় দেননি। এ বিষয়টি নিয়েই মূলত বিচারাঙ্গনে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের একাংশ জানতে চাইছেন, দুই বছরের প্রচলিত পর্যবেক্ষণকাল শেষ হওয়ার আগেই যদি স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের বিচারিক দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে কোনো পূর্ণাঙ্গ রায় না লেখার পরও স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আইনাঙ্গনের একটি অংশে অসন্তোষ ও সমালোচনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, প্রচলিত বিচারিক রীতি ও নির্ধারিত সময়সীমার আগে অতিরিক্ত বিচারপতিদের স্থায়ী করার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন বা অন্য কোনো ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাঁরা। তবে শেষ পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়া ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে ওই ২২ বিচারপতিকে নির্ধারিত সময়ের আগেই স্থায়ী করা হয়েছে, সেটিই বর্তমানে উচ্চ আদালত ও আইনাঙ্গনের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে এর বিকল্প অকল্পনীয়: খলিলুর রহমান
জাতিসংঘ নিখুঁত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, তবে এটি অপরিহার্য এবং এর কোনো বিকল্প কল্পনাই করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে শুক্রবার নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে তিনি এ মন্তব্য করেন। নিজের পোস্টে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন এবং যেসব প্রক্রিয়া বা নীতি এখন আর কার্যকর নয়, সেগুলোতে দ্রুত সংস্কার আনা জরুরি। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের আস্থা এমনি এমনি চেয়ে নেওয়া যায় না, বরং কাজের মাধ্যমে তা অর্জন করে নিতে হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিল্প খাতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তনকামী কণ্ঠস্বরদেরও আরও বেশি করে যুক্ত করার আহ্বান জানান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আরও বলেন, চলতি অধিবেশন এমন একটি নতুন জাতিসংঘ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলায় যথেষ্ট বাস্তববাদী, প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে যথেষ্ট সাহসী এবং গুরুত্বপূর্ণ সব অংশীজনকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্মুক্ত মানসিকতার। তার ভাষায়, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে ধারণ করেই জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা সম্ভব। খলিলুর রহমানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন বিশ্বজুড়ে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তার এই বার্তা সংস্থাটির সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হলেন জাইমা রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই কার্যালয়ে তাঁর মূল দায়িত্ব হবে আইনি বিষয়াদি তদারকি করা। খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে মোট ৪০ জন কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এদের মধ্যে জাইমা রহমানসহ মোট ছয়জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই কার্যালয়ের উপপ্রধানের দায়িত্বে থাকবেন বাংলাদেশি কূটনীতিক আব্দুল আলিম। এ ছাড়া উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কৌশলগত পূর্বাভাস বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে থাকছেন মাফিজুল ইসলাম, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে জাকির আহমেদ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দেশগুলো বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মো. রফিকুল আলম মোল্লা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, চলতি বছরের ২ জুন তিনি এই অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে জাইমা রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী মূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সার্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আধুনিকীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক। তিনি জানান, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়ানো, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষিত এসব কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ‘ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এই বৈঠকে। এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এতে গেটস ফাউন্ডেশন ছাড়াও ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ বিশ্বের একাধিক শীর্ষস্থানীয় সংস্থার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের প্রেক্ষাপটে এই বৈঠক বৈশ্বিক মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। এতে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যায়ে দাতব্য ও মানবিক সহযোগিতার পরিসর বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে।

জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রথম দিনেই ১০ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, জানালেন মাহ্দী আমিন
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরের প্রথম দিনেই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মোট ১০টি কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে) এক সংবাদ সম্মেলনে সফরের প্রথম দিনের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। জানান, আগে থেকে ঠিক করা ১২টি কর্মসূচির মধ্যে সময়ের অভাবে দুটিতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী, বাকি দশটিতে সরাসরি যোগ দেন। দিনের শুরুতে জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ প্রাতরাশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। দিন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত নৈশভোজেও সস্ত্রীক যোগ দেন তিনি। সাধারণ অধিবেশনের উদ্বোধনী প্লেনারি সেশনেও অংশ নেন তারেক রহমান, সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। মাহ্দী আমিনের ভাষ্যে, এটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ একটি মুহূর্ত—কারণ এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘে দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও এবার একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই ধারা এগিয়ে নিচ্ছেন তারেক রহমান। কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হিসেবে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি, যেখানে সার্ক অঞ্চলে পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনযোগাযোগ বাড়ানোর বিষয় উঠে আসে। এ ছাড়া হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি তারেক রহমানকে নির্বাচনী বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান এবং তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ দেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি বৈঠক হয়েছে—একটি জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার সঙ্গে, অন্যটি মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সঙ্গে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রিত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। পরদিন বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে এ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সাইডলাইন অনুষ্ঠান হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। অর্থনৈতিক আলোচনার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও বাজেট সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত কথা হয় সেখানে। তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল ও মেটার সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলেও মেটার ক্ষেত্রে তাঁর মনোনীত একটি প্রতিনিধিদল আলোচনা চালিয়ে যায়, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি নিয়ে কথা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।

বিশ্বসভায় তৃতীয় প্রজন্ম, নতুন বাস্তবতায় তারেক রহমান
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেই মঞ্চে বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন সময় যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হতে যাচ্ছে। চার দশকের বেশি সময় আগে যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বব্যবস্থার বৈষম্য, দারিদ্র্য ও উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পরে একই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর এই ভাষণ জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর বা নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক মাত্রাটি পুরোপুরি ধরা পড়বে না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন এবং একটি রাজনৈতিক পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতির ধারাবাহিকতা। গল্পটির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। সে বছরের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন বিশ্ব অর্থনীতি ছিল গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বৈষম্য আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান প্রশ্ন তুলেছিলেন—বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও সহযোগিতার এত প্রতিশ্রুতির পরও কেন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও ক্ষুধার মধ্যে পড়ে থাকবে? তাঁর সেই প্রশ্ন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে উঠে আসেনি। এর পেছনে ছিল সে সময়কার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-ভাবনার বড় বিতর্ক। একদিকে ছিল আধুনিকায়ন তত্ত্ব। ডব্লিউ. ডব্লিউ. রস্টোর ‘স্টেজেস অব ইকোনমিক গ্রোথ’ বা প্রবৃদ্ধির পর্যায় তত্ত্বের মতো ধারণায় মনে করা হতো, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত বিশ্বের অনুসৃত অর্থনৈতিক কাঠামোর পথে এগোয় এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রযুক্তি ও বৈদেশিক সহায়তা পায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ‘টেক-অফ’-এর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে। অন্যদিকে নির্ভরশীলতা তত্ত্ব বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কেন্দ্র ও প্রান্তের অসম সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে নিজেদের অবস্থান বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন ছিল ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে ঘোষিত নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা এনআইইও। পরবর্তী সময়ে উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ তখন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও খাদ্যসংকটে থাকা একটি নবীন রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অভিঘাত তখনো গভীর। প্রায় সাড়ে নয় কোটি মানুষের দেশটির সামনে খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারির প্রশ্ন। তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ, জ্বালানি ও বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের চাপ কমাতে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে—এমন ধারণাও তিনি সামনে আনেন। এখানে তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মনির্ভরতার ধারণা। তাঁর কাছে আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজেদের উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সমান মর্যাদায় অংশ নেওয়া। অর্থাৎ একদিকে তিনি বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ন্যায্য বাণিজ্যের দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দুইয়ের সমন্বয় তাঁর আন্তর্জাতিক বক্তব্যকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সেই বক্তব্যের প্রায় ১৩ বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক অধিবেশন, ২০০২ সালে শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন আয়োজনে তিনি বক্তব্য দেন। অর্থাৎ ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার ধারাবাহিকতা তৈরি করে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্ম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেবেন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় স্থান পাবে। এই বিষয়গুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ১৯৮০ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের বাস্তবতার পার্থক্য কতটা। জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক ন্যায়ের আলোচনায় প্রধান প্রশ্ন ছিল খাদ্য, তেল, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। চার দশক পর সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, জলবায়ু অর্থায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নতুন বাস্তবতা। বিশেষ করে জলবায়ু বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে ‘Climate Action and the Just Transition’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিছক পরিবেশনীতি নয়। উপকূলীয় এলাকার মানুষের বসতি, কৃষি, পানির নিরাপত্তা, জীবিকা এবং অভিবাসনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকি দেশটির জন্য অনেক বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—এসবের সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশের উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য দায়বণ্টনের প্রশ্ন বাংলাদেশের কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখানেই ১৯৮০ সালের উন্নয়ন-ন্যায়ের প্রশ্নটি নতুন রূপে ফিরে আসে। তখন প্রশ্ন ছিল দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ন্যায্য বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রেখেছে, তাদের অভিযোজনের ব্যয় কে বহন করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে? প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও নতুন প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির চরিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো ও অর্থায়নে বৈষম্য তৈরি হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নতুন ধরনের কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। ফলে প্রযুক্তিতে ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দাবি হয়ে উঠছে। তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের আরেকটি বড় বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় নয় বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। ফলে সংকটটি এখন আর কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার—রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই। জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অবস্থান আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের আরেকটি বিশেষ দিক বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯ ভোট পান। এর মধ্য দিয়ে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হয়েছেন। ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশের জন্য এই সমাপতন কূটনৈতিকভাবে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনকে জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের সামনে ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখা, খাদ্য ও দারিদ্র্যের সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশীদারি নিশ্চিত করার প্রশ্ন। ১৯৯০-এর দশক ও পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের সময়ে বাংলাদেশের সামনে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপরিচয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতির প্রশ্ন। আর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক বাস্তবতা—জলবায়ু সংকট, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার। এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—পরিবর্তিত হয়েছে প্রশ্নের ধরন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে। ১৯৮০ সালে যে কণ্ঠ বৈশ্বিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল বিশ্বের ন্যায্য অধিকারের কথা বলেছিল, পরবর্তী সময়ে সেই আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতা বহন করেছেন খালেদা জিয়া। এবার সেই ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়ে প্রবেশ করছেন তারেক রহমান। তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ তাই একই সঙ্গে অতীতের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশার একটি সংযোগস্থল। তবে ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণ শেষ পর্যন্ত কতটা নতুন নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়, বাংলাদেশের বৈশ্বিক অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে উপস্থাপিত হয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সেই অবস্থান কতটা কার্যকর সহযোগিতায় রূপ নেয়—সেটিই হবে এই সফরের বাস্তব তাৎপর্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতিসংঘের মঞ্চে সেদিন উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রশ্নগুলো—গণতন্ত্র, উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, প্রযুক্তিতে সমতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা। জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের এই আন্তর্জাতিক যাত্রায় তাই ২৪ সেপ্টেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন সময়কে একই বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্ত করার একটি মুহূর্ত। অতীতের অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কী বার্তা দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে বিশ্ব।

রাজউকের সেবায় ওয়ানস্টপ ব্যবস্থা, উন্নয়ন প্রকল্পে নজরদারি বাড়ছে
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি কমাতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকেই নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করা যাবে এবং দ্রুত অনুমোদন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পের যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছে কমিটি। সোমবার জাতীয় সংসদে কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান কমিটির সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল জানান, এত দিন রাজউকের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদনকারীদের ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যেতে হতো। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রমেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যা দূর করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী ও রাজউকের চেয়ারম্যান এ উদ্যোগে সম্মতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, নকশা অনুমোদনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে এক জায়গা থেকেই আবেদন গ্রহণ ও দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে কমিটির সদস্য বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম দায়িত্ব হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কমিটি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা যাচাই করবে। কোনো অনিয়ম, অস্বচ্ছতা বা দুর্নীতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, আগের মতো অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ আর রাখা হবে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অযথা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগও দেওয়া হবে না। আবাসন সংকট ও স্বল্পমূল্যে ফ্ল্যাট নির্মাণের বিষয়ে শেখ মজিবুর রহমান বলেন, বিদ্যমান নগর বিধিমালার কিছু জটিলতার কারণে আবাসন খাতের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) সংক্রান্ত জটিলতার কারণে অনেক ল্যান্ড ডেভেলপার আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। তিনি জানান, বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্যাপ বিধিমালা ও নগর গৃহায়ন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। গৃহায়ন বিধিমালা না থাকায় ল্যান্ড ডেভেলপাররা প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যায় পড়ছেন। এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সভার আগেই বিধিমালা অনুমোদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংসদীয় কমিটি। শেখ মজিবুর রহমান জানান, নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করলেও যেসব ভবনের নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি, সেগুলো নির্দিষ্ট জরিমানা বা শাস্তির আওতায় এনে রাজউকের বিধি অনুযায়ী বৈধ করার বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের সুবিধা নিশ্চিত করাই কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে কমিটির সদস্যরা অঙ্গীকারবদ্ধ। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ও কমিটির সঙ্গে একমত হয়েছে। সংসদ সদস্য ইকবাল জানান, কমিটির প্রথম বৈঠক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

তিন শক্তির সমীকরণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন পরীক্ষা
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একাধিক শক্তির স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার পর্যায়ে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কীভাবে অক্ষুণ্ন রাখা যায়। এই বাস্তবতার সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ। ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা এসব চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর কয়েক দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, এ বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি জানান, ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই ঘটনাকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের একটি ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি এবং ভারতের নিরাপত্তাগত স্বার্থ—সব মিলিয়ে যে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর নতুন মূল্যায়ন। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও নয়াদিল্লির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ঘোষিত অবস্থান হলো—জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না বাড়িয়ে সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানো হবে; কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা যাতে সংকুচিত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই দীর্ঘদিনের মূলনীতি বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন করে পরীক্ষা দিচ্ছে। কারণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশের মতো একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারে না। আবার কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়লেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কও গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়িয়ে ক্রমেই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা পেয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। চুক্তিটি দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং এতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। (The American Presidency Project) ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে শুধু অতীতের রাজনৈতিক চাপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। রপ্তানি বাজার, শুল্ক, বিনিয়োগ, সরবরাহশৃঙ্খল, প্রযুক্তি ও জ্বালানি—সবকিছুই এখন সম্পর্কটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা। যুক্তরাষ্ট্র যেমন তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করছে, তেমনি বাংলাদেশেরও বাজার, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ গ্রহণের সময় দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধিও গত কয়েক বছরে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এ সম্পর্কের নতুন মাত্রা তুলে ধরে। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়’ গঠনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের বিষয় উঠে এসেছে। মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, যোগাযোগ অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও এই সম্পর্কের ব্যাপ্তি বোঝায়। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিস্তারকে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক জোটে যোগদানের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বন্দর, প্রযুক্তি, জ্বালানি কিংবা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কি না—তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হলো বাণিজ্য ভারসাম্য। চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও চীনা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়ন, ঋণের শর্ত, স্থানীয় শিল্পে প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। অর্থাৎ সম্পর্কের গভীরতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্ভরতার মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বাস্তবতা আরও জটিল। ভৌগোলিক নৈকট্য, প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য অন্য যেকোনো শক্তির চেয়ে ভিন্ন ধরনের অংশীদার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি নদীর পানিবণ্টনের বিষয়গুলোও সম্পর্কের আলোচনায় রয়েছে। এই কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কের নিজস্ব ইতিহাস, পারস্পরিক নির্ভরতা ও দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনার উদ্যোগ এই নতুন বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে পর্যালোচনা মানেই সব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিগুলো পরীক্ষা করে অসঙ্গতি বা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় থাকলে তা চিহ্নিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পর্যালোচনার পদ্ধতি। কোনো চুক্তি কোন সরকারের সময়ে হয়েছে—এটি একমাত্র বিবেচনা হতে পারে না। চুক্তির আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক ফলাফল, বাস্তব প্রয়োগ, নিরাপত্তাগত প্রভাব, পারস্পরিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ দায়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভারতের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য এসেছে, তাতে দিল্লি বলেছে তারা এ বিষয়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো যোগাযোগ পায়নি এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এটিকে সরাসরি চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেয়ে ভারতের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ রক্ষার অবস্থান হিসেবে দেখা বেশি সংগত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সামনে অপেক্ষা করছে—গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ভারতের সংসদীয় নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে চুক্তি নবায়ন নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও বর্তমান চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অতএব ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো মৌলিক দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও বাংলাদেশকে সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে চীনের সম্ভাব্য সহযোগিতা যেমন বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যও এর কৌশলগত ও ভৌগোলিক গুরুত্ব রয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পে বিদেশি অংশীদার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু অর্থায়ন বা প্রযুক্তির সুবিধা দেখলে চলবে না। প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং প্রতিবেশী দেশের নিরাপত্তাগত উদ্বেগ—সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থায় যেকোনো বড় পরিবর্তন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ বাড়ানো একটি বিকল্প হতে পারে। তবে তার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহকারী দেশ বহুমুখীকরণ এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেতে হবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদার ও অবকাঠামো সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অংশীদার। ভারতের সঙ্গে রয়েছে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য এবং সীমান্ত অর্থনীতি। তবে তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন এক নয়। তাই একই মাপকাঠিতে তিনটি সম্পর্ককে বিচার না করে খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেখানে বাজার দরকার, সেখানে বাজার; যেখানে বিনিয়োগ দরকার, সেখানে বিনিয়োগ; যেখানে প্রযুক্তি প্রয়োজন, সেখানে প্রযুক্তি; আর যেখানে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল—এই পৃথক পদ্ধতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সম্ভাব্য নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশ্ন উঠলে সেটিকে শুধু মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এ ধরনের কোনো কাঠামো বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং প্রতিটি উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মূল্যায়ন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এমন কোনো অবস্থায় নেই যে তাকে সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বরং বাস্তবতা হলো—একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, চীনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিস্তার এবং ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ১০১টি ভারতীয় চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে এর ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে পর্যালোচনার মানদণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্ন কোনো একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়। বরং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের নিজস্ব ক্ষেত্র ও প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাজার ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক ও আঞ্চলিক সংযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রের গুরুত্ব আলাদা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ সম্পর্ক সংকুচিত করা নয়; বরং এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে সহযোগিতার সুযোগ সর্বোচ্চ হবে কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অযথা সীমিত হবে না। বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি দূরে থাকতে পারবে না। আবার কোনো একটি শক্তির কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়াও দীর্ঘমেয়াদে নতুন নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন আবেগনির্ভর অবস্থানের বদলে বাস্তববাদী কূটনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি, অর্থনৈতিক হিসাব এবং নিরাপত্তাগত মূল্যায়নের সমন্বয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হবে—কত বড় শক্তির সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো, তা নয়; বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ন রাখা গেল। এ ভারসাম্যই আগামী দিনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

জাতিসংঘ সফরে নতুন নজির গড়তে চান তারেক রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দীর্ঘদিনের একটি চিত্র ছিল—বড় বহর, দীর্ঘ সফর, বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং নানা আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত সময় পার করা। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বড় সফরসঙ্গী দল, একের পর এক বৈঠক এবং নানা কর্মসূচিকে ঘিরে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও অতীতে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের ভাষায়, কখনো কখনো জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের চেয়ে সফরের আনুষ্ঠানিকতা ও বহরের আকারই বড় হয়ে উঠেছিল। এবার সেই প্রচলিত রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফর রাখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ও কর্মসূচিনির্ভর। সফরসঙ্গীর সংখ্যাও প্রয়োজনের মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, অতিরিক্ত সময় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় থাকবে না—এমন একটি বার্তাই সামনে এসেছে। এই পরিবর্তনকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের পুরোটা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয়সংযম, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রয়োজনের বাইরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় না করার একটি নীতিগত অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হবে, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে—কিন্তু সেই কাজের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে কোনো আয়োজন না করার দৃষ্টিভঙ্গিই এবারের সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে সময়সীমা ছিল আরও দীর্ঘ। ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সফরের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিউইয়র্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শহরেও যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পরে সফরসূচি কাটছাঁট করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ অবস্থানের পরিবর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একজন সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের প্রতিটি দিন মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রটোকল, যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য নানা ধরনের ব্যয়। ফলে সফরের সময় যতটা প্রয়োজনের মধ্যে রাখা যায়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ততটাই সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত দেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন। এবারের সফরের তাৎপর্য এখানেই—বাংলাদেশ বিশ্বসভায় যাচ্ছে, কিন্তু দেখানোর জন্য নয়; প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া, বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং দেশের অবস্থান স্পষ্ট করাই হবে সফরের মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর সফরের এই সংক্ষিপ্ততা রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃচ্ছ্রসাধনের বৃহত্তর নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারি ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নিজের জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যয়সংযমের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ও নাশতায় ব্যয়সীমা নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ—এসবকে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সরকারি অর্থের ব্যবহারকে সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক রাখেন, তাহলে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও একই ধরনের ব্যয়সংযমের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে জাতিসংঘ সফরের মতো আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতেও প্রয়োজন ও ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশের অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে ছিল। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অনেক শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। বিদ্যুৎ খাতেও জ্বালানি সরবরাহের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় একাধিক ধাপে বিপুলসংখ্যক নতুন গ্যাসকূপ খনন ও পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পেও বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি ত্রুটি দূর করে উৎপাদন বাড়ানো, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তিতে রূপান্তর এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। দেশের অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি খাত। শিল্পকারখানা চালু না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, উৎপাদন বাড়বে না, রাজস্ব আয়ও বাড়বে না। এ কারণে বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের সমস্যাগুলো সরাসরি শুনছেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঋণ, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা এবং ব্যবসার পরিবেশ—এসব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। শিল্প খাত সচল হলে এর প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর পড়ে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার। একটি কারখানা চালু হওয়ার অর্থ নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া; উৎপাদন বাড়ার অর্থ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া; আর বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হওয়া। এই বাস্তবতা বিবেচনায় বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও সরকারের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; কৃষক, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে আনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া এবং সে অনুযায়ী নীতি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর উদ্যোগও বর্তমান সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য যেমন আর্থিক চ্যালেঞ্জ, তেমনি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি খাতকে আরও কার্যকর করার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণে কৃচ্ছ্রসাধন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি তাই পরস্পর সম্পর্কিত। দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি অল্প সময়ে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, জ্বালানি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন। তবে সরকারের দাবি, সাত মাসের মধ্যেই এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বার্তা নিয়েই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন, মহামারি প্রতিরোধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটিাধিক আলোচনা ও পার্শ্ব বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং এই সংকটের আন্তর্জাতিক সমাধানের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, জাতিসংঘের অধিবেশন তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে। পাকিস্তান, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভুটান, ক্রোয়েশিয়া, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময় নয়; বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বাস্তব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নিউইয়র্ক সফরটি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব হয়ে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে কার্যকর কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। একসময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সঙ্গে বড় বহর, দীর্ঘ সফর এবং নানা আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি আলোচনায় থাকত। এবার সেই জায়গায় প্রয়োজনীয় প্রতিনিধিদল, সংক্ষিপ্ত সফর এবং নির্দিষ্ট কূটনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে আনা হয়েছে। দেশের ভেতরেও একই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার—রাষ্ট্রীয় অর্থ সীমিত, তাই তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ জনগণের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য। জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন, সেটি হবে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি দেশ। যে দেশ অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে, শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে। সাত মাসে দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি নতুন পথরেখা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী সেই বাংলাদেশের কথাই বিশ্বসভায় তুলে ধরবেন—যে বাংলাদেশ সংকটকে অস্বীকার না করে তা মোকাবিলা করতে চায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমাতে চায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের এই নতুন বার্তার মূল সুর হতে পারে—সফর হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ব্যয় হবে জনস্বার্থে এবং কূটনীতির প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশ।

ডাকসু আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি, সামনে বাংলাদেশের ইতিহাসের বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিতর্ক যেন আবারও ফিরে এসেছে একটি প্রতীকী জায়গায়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায়। সংস্কারের পর ১৩ সেপ্টেম্বর ডাকসুর আর্কাইভটি খুলে দেওয়া হয়। সেখানে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন স্থান পায়। এরপরই শুরু হয় প্রতিবাদ। ১৪ সেপ্টেম্বর এক সাবেক শিক্ষার্থী জিন্নাহর দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পরদিন একদল শিক্ষার্থী ডাকসুর প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি রেখে প্রতিবাদ করেন। ঘটনাটি নিছক একটি ছবি রাখা বা সরানোর প্রশ্ন নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের কি ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখানো হবে, নাকি তাদের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বাদ দেওয়া হবে? ইতিহাসের নথি মুছে ফেলার মাধ্যমে ইতিহাস বদলায় না। বরং একটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে বোঝার জন্য তার বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হয়। জিন্নাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার প্রশ্ন তার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। কারণ তিনি ১৯৪৮ সালেই মারা যান। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রটি কেমন হবে—বিশেষ করে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে—তার অবস্থান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি। একই বছর মার্চে ঢাকায় এসে জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর এই অবস্থানের প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষার্থীরা। (The Daily Star) এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালের ভাষার দাবি পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলার স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ছাত্রসমাজের দাবিও ছিল ভাষার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই দাবি বিস্তৃত হয়েছে। ভাষার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রাম স্বাধীনতার দাবিতে পৌঁছায়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসও ১৯৫২ সালে শুরু হয়নি। ১৯৪৭-৪৮ সাল থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তমদ্দুন মজলিশ, ছাত্রসমাজ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতা শুরু হয়। সভা, মিছিল, ধর্মঘট, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। এই ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। অতএব, ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকলে শুধু তাঁর ছবি রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর ভাষানীতি, ১৯৪৮ সালের রাজনৈতিক অবস্থান এবং তার বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়ার নথিও সেখানে থাকা উচিত। একইভাবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব, ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংগ্রামের দলিলও থাকা দরকার। একই কথা প্রযোজ্য জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও। ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল—এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা। দলটির তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের কয়েকজন নেতার ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোতেও আলোচিত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। তবে এখানে ব্যক্তি, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট সময়ের ভূমিকা আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো ব্যক্তির ছবি একটি আর্কাইভে রাখা মানেই তার সব কর্মকাণ্ডের সমর্থন নয়। বরং ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার কাজ হওয়া উচিত—কেন তিনি বা সংগঠনটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কোন অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই অবস্থানের পরিণতি কী হয়েছিল—তার প্রমাণ হাজির করা। গোলাম আযমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, ১৯৭১ সালের অবস্থান এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এসব বিষয়কে বাদ দিলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হবে; আবার কেবল একটি প্রতিক্রিয়াশীল প্রতীকে পরিণত করলেও ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। জামায়াতে ইসলামীর ভেতরেও ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে—এ তথ্যও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সামনে এসেছে। দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত স্মৃতিকথা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালে এ বিষয়ে একটি খসড়া বিবৃতিও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি। এই তথ্যও ইতিহাসের অংশ। অর্থাৎ ইতিহাস শুধু বাইরের সমালোচনা দিয়ে তৈরি হয় না; একটি সংগঠনের ভেতরের আত্মসমালোচনা, মতবিরোধ এবং সিদ্ধান্তহীনতার নথিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির বাস্তবতাও এই আলোচনাকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ২৮টি কেন্দ্রীয় পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায়। ভিপি, জিএস ও এজিএস পদেও তাদের প্রার্থীরা জয়ী হন। এই নির্বাচনী ফল বর্তমান ছাত্ররাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। কিন্তু কোনো নির্বাচনী ফলাফল অতীতের ইতিহাসকে বাতিল করে না। একইভাবে অতীতের কোনো রাজনৈতিক ভূমিকা দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যেক সদস্যের অবস্থান নির্ধারণ করাও সঠিক নয়। তরুণদের কী ভাবতে হবে, কাকে সমর্থন করতে হবে কিংবা কোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তা বলে দেওয়ার চেয়ে তাদের সামনে তথ্য ও নথি তুলে দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারা জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তব্য পড়ুক। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব পড়ুক। ভাষা আন্দোলনের নথি ও সে সময়ের সংবাদপত্র দেখুক। ১৯৭১ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রকাশিত বিবৃতি ও প্রচারপত্র পড়ুক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় পড়ুক। আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের বিবরণও দেখুক। এরপর তারা নিজেদের মতো করে প্রশ্ন তুলুক এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছাক। ইতিহাসের নথি যত বেশি মানুষের সামনে থাকবে, ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ তত কমবে। এখানেই একটি জাদুঘর বা ঐতিহাসিক আর্কাইভের মূল দায়িত্ব। কোনো সংগ্রহশালা কোনো পক্ষের প্রচারমঞ্চ নয়। আবার কোনো পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলার জায়গাও নয়। সেখানে থাকা উচিত দলিল, ছবি, সংবাদপত্র, বক্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং ঘটনাপ্রবাহ—যাতে দর্শক নিজেই একটি সময়কে বুঝতে পারেন। ডাকসুর আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবি থাকলে তার পাশে ইতিহাসটিও থাকবে কি না। জিন্নাহ থাকলে তাঁর ভাষানীতির ইতিহাস থাকবে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত থাকলে তাঁর প্রস্তাব থাকবে। ভাষা আন্দোলনের নথি থাকবে। ২১ ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণের ঘটনাও থাকবে। এরপর আসবে ছয় দফা, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ার ঘটনা এবং ১৯৭১ সালের মার্চের সামরিক অভিযান। থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। থাকবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ভূমিকা। যারা স্বাধীনতার পক্ষে ছিল, তাদের ভূমিকা থাকবে; যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাদের অবস্থানও থাকবে। রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের ভূমিকা নিয়ে যে নথি রয়েছে, সেগুলোও থাকবে। কারণ ইতিহাসকে পছন্দমতো বেছে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের জন্ম কোনো একটি ছবি, কোনো একটি ভাষণ কিংবা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের ফল নয়। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের পরিণতি। ভাষার অধিকার থেকে রাজনৈতিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম—এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগও থাকতে পারে। নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানের সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি কিংবা অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে। এসবের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাস অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়। বরং অতীত সম্পর্কে সৎ থাকা একটি পরিণত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে। কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি ইতিহাসের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রয়োজনও আছে। ডাকসুর সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই শুধু ছবি ছেঁড়া বা ছবি পদদলিত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর দিকটি আড়ালে থেকে যাবে। এটি আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে—আমরা কি ইতিহাসকে আবেগ দিয়ে দেখব, নাকি দলিল দিয়ে বুঝব? ছবি ছিঁড়ে ফেলা ইতিহাসের সমাধান নয়। আবার বিতর্কিত কোনো ব্যক্তির ছবি রেখে তার রাজনৈতিক ভূমিকা গোপন করাও ইতিহাসচর্চা নয়। ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর হলো ইতিহাসের পূর্ণ নথি। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। বাঙালির রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রাম হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষে, বিপক্ষে কিংবা ভিন্ন অবস্থানে ছিলেন—সেসব অবস্থানেরও নথি রয়েছে। এই সবকিছু মিলেই বাংলাদেশের ইতিহাস। কোনো ছবি সেই ইতিহাস বদলাতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগানও পারে না। কূটনৈতিক সম্পর্কও পারে না। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হোক। প্রশ্ন উঠুক। পুরোনো নথি নতুন প্রজন্ম আবার পড়ুক। ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে আসুক। কিন্তু প্রমাণিত ঘটনাকে বাদ দিয়ে নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা যেন না হয়। কারণ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস কোনো দেয়ালে ঝোলানো ছবিতে লেখা হয়নি। সেই ইতিহাস লেখা হয়েছে মানুষের ভাষার অধিকারের সংগ্রামে, রাজনৈতিক আন্দোলনে, ভোটে, রক্তে, যুদ্ধে এবং আত্মত্যাগে।

আসিফ মাহমুদকে ঘিরে ১১ হাজার কোটি টাকার রহস্য, তদন্তে দুদক
বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে সেই সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উঠেছে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা (আনুমানিক ৯০ কোটি মার্কিন ডলার) পাচারের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিহীন প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে গড়ে তোলা এক ‘মেটিকুলাস’ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ লুণ্ঠন ও ডিজিটাল রুটে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্ত ও অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ও ৪৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট সাম্রাজ্য: সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা অসম্ভব। এর উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, তার অধীনস্থ তিনটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের টাকা থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলার প্রেক্ষাপট তার অনুকূলেই ছিল। কারণ ওই সময় আমলারা ছিলেন লাজুক অবস্থানে। জনপ্রতিনিধিদেরও উপস্থিতি ছিল না। জানা গেছে, স্থানীয় সরকারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৪২,৪৩৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে আওয়ামী সরকারের বাজেটের অবশিষ্ট অংশ যোগ করে মোট ছিল ৪৪,২৪৩ কোটি টাকা। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাজেট ছিল ২,৪২৩ কোটি টাকা। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৪৩৮ কোটি টাকা সহ মোট বাজেট ছিল ৪৭,১০৪ কোটি টাকা। দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি অর্থব্যয়ের একক ক্ষমতা ভোগ করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানী কর্মকর্তারা জানান, আসিফের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেটের অঙ্ক ছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে এই বিপুল পরিমাণ বাজেট থেকে পরিকল্পিতভাবে ১১ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় ছিল না। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পুরো দুর্নীতি প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ("Meticulous Design") আওতায়। রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ: স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ছিল না। আমলাতান্ত্রিক ভয় ও একক নিয়ন্ত্রণ: তৎকালীন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কর্মকর্তা ও আমলারা তটস্থ ছিলেন। এই প্রশাসনিক ভীতিকে কাজে লাগিয়ে আসিফ মাহমুদ নিজের পছন্দের কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠদের সমন্বয়ে একটি নিজস্ব ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন। বেনামি টেন্ডার ও ভুয়া প্রকল্প: বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি ও শ্রম কল্যাণের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি এই সিন্ডিকেটের হাতে নেওয়া হয়। আধুনিক ক্রিপ্টো-পাচার: যেভাবে ডিজিটাল রুটে বিদেশে গেল ৯০ কোটি ডলার সম্প্রতি অভিযোগ ওঠার পর সজীব ভূঁইয়ার সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দাবি করেন—একটি মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে পাচারের নতুন ও আধুনিক কৌশলের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রথাগত হুন্ডির বাইরে ব্লকচেইন: সরাসরি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা বা প্রথাগত হুন্ডি চ্যানেলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সির (Crypto Currency) মাধ্যমে টাকা পাচার করা হয়েছে। ‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ চক্রের ভূমিকা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থ ও প্রযুক্তি খাতে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু বিতর্কিত ‘প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ’ এই পাচার প্রক্রিয়ায় সহায়তা প্রদান করেন। পাসওয়ার্ডভিত্তিক ওয়ালেট: দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিপরীতে উত্তোলিত কমিশন ও আত্মসাতের টাকা বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তর করে শেষ পর্যন্ত পাসওয়ার্ডভিত্তিক নিরাপদ ‘ক্রিপ্টো ওয়ালেটে’ রূপান্তর করা হয় এবং বিদেশে পাচার সম্পন্ন হয়। নির্বাচিত সরকারের আমলেও আড়ালের চেষ্টা ও দুদকের তৎপরতা: অভ্যুত্থানের প্রধান স্লোগান ছিল দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান। কিন্তু অভ্যুত্থানের পেছনের রূপকার বলে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের এই ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হওয়ায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সাবেক এই উপদেষ্টাকে ঘিরে তোলপাড় থামেনি। আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে এখনো এই চক্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী সদস্য সরব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। ফাইল ও নথিপত্র জব্দ: আসিফ মাহমুদের দেড় বছরের মেয়াদে গ্রহণ করা সমস্ত মেগা প্রকল্প, দরপত্র নথি, ই-জিপি ফাইল এবং বিশেষ বরাদ্দ সংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করছে দুদক। ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত: অর্থ হস্তান্তরের রুট শনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট যৌথভাবে ডিজিটাল ট্রানজেকশন ট্র্যাকিং শুরু করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, ডিজিটাল অর্থ হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট রুট এবং ফাইলপত্রের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষ হলেই দেশের এই ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির বিশদ চিত্র আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট আকারে আদালতে দাখিল করা হবে।

বিদ্যুৎ সংকট: মন্ত্রীকে দোষারোপে কি সমাধান মিলবে?
কে না জানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যসব রাজনীতিবিদের মতো কাজে-কর্মে এখন আর গতানুগতিক নন। কে না জানে রাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী হয়েও তিনি এখন অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন। কথার চেয়ে কাজের চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে চলেছেন। তাঁর সাদাসিধে ব্যক্তিত্ব আর স্বচ্ছতা সবার জন্যই অনুকরণীয়। সম্প্রতি দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও সংকট নিয়ে নিজের অকপট স্বীকারোক্তি তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি সরকারপ্রধান হিসেবে বিদ্যমান সংকটকে মেনে নিচ্ছেন আবার তা থেকে উত্তরণে সর্বশক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি; কিন্তু তাই বলে পুরো বিদ্যুৎ সংকটটি এই সরকারের তৈরি—বিষয়টি এমন নয়। তারপরও প্রধানমন্ত্রী জাতির কাছে যেভাবে সংকটের সরল স্বীকারোক্তি করেছেন, তাতে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনন্য উদাহরণ তৈরি করে তিনি ছোট হয়ে যাননি; বরং এর মধ্য দিয়ে তিনি আরও বড় মনের পরিচয় দিয়েছেন। এটিই উন্নত রাজনীতির মহিমান্বিত দিক। এমন চর্চা যেমন তাঁর মহৎপ্রাণ দৃষ্টিভঙ্গির সরল প্রকাশ; তেমনি সংসদের মতো রাষ্ট্রের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থলে বিদ্যুৎ সংকটের একক দায় ইঙ্গিত করে খোদ বিদ্যুৎমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু বিতর্কিত মন্তব্যও নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উদারতার প্রশংসা যেমন তাঁর প্রাপ্য, তেমনি কেবিনেটের কারও নিন্দা বা সমালোচনাও প্রকারান্তরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা নিন্দা করার শামিল। কারণ তিনিই সরকারপ্রধান। তাঁর কোনো মন্ত্রীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে অকারণে তাঁকে দায়ী করা হলে, এটিও প্রধানমন্ত্রীর অসম্মানের কারণ হতে পারে। জাতীয় সংসদ মানুষের যাবতীয় প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে, সেখানে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি মন্তব্য করা হয়েছে যে, ‘মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনি, তার লম্বা, তাই বিদ্যুৎ চলে যায়।’ প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসা করার বিপরীতে বিদ্যুৎমন্ত্রীর এমন বিবৃতি উদ্ধৃত করে অসম্মানজনক মন্তব্য বিভিন্ন মহলে বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে এ ধরনের মন্তব্যকে খুবই দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে সমালোচনা করছেন। সংসদের একজন সাধারণ এমপিও সম্মানিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারা সংসদে নানান বিষয়ে কথা বলেন, বিতর্ক করেন; আবার সমাধানেরও পথ তৈরি করেন। এই যে সংসদের সৌন্দর্য, এটি নষ্ট হয়, যখন সংসদেরই কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অন্যায্যভাবে কোনো বিষয়ে কাউকে দায় দেন। কোনো একটি সংকটের যৌক্তিক কারণকে উপেক্ষা করে যখন ব্যক্তির মর্যাদাহানির লক্ষ্যে পক্ষপাতদুষ্ট তীর্যক মন্তব্য করা হয়, তখন সেটি পুরো সরকারব্যবস্থার কাঠামো, নেতৃত্বে আর ইমেজে গিয়ে আঘাত করে। আমরা যদি বিদ্যুৎ সংকট নিয়েই কথা বলি, তাহলে এর নেপথ্যের কারণও আমাদের জানা দরকার। একজন মন্ত্রী হচ্ছেন একটি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নির্বাহী। আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সবার শীর্ষ নির্বাহী। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বুঝতে হবে যে, তিনি কোনো একক সত্তা নন। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি টিমের সদস্য। আর মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন কোনো কথা বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ের তাঁর সহকর্মীদের মাধ্যমে অবগত হয়েই কিছু বলেন। তাঁর সহকর্মীরাও তাঁকে একটি পরিস্থিতি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে, কারিগরি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা-দুর্বলতা পর্যালোচনা করেই অবহিত করে থাকেন। আর তিনিও সেভাবে প্রস্তুত হন। দেশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এটি কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু কেন এই সংকট? কীভাবে এটি এই পর্যায়ে এলো? কারা এর নেপথ্যে? নিশ্চয়ই এসব প্রশ্নের জবাব রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র সাত মাস হলো। বিদ্যুৎ খাতের মতো একটি বিশাল খাতের সংস্কার কিংবা এর কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করার সুযোগও এখন হয়ে ওঠেনি সরকারের। এটিই বাস্তবতা। একটি উদীয়মান অর্থনীতি, বিরাট শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বহুমাত্রিকতায় বিদ্যুতের অসীম চাহিদার বিপরীতে বিদ্যমান অবকাঠামো, কারিগরি দুর্বলতা, জনবল ও জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাসহ নানান জটিল দিক রয়েছে, সেগুলো বিদ্যুৎ সঞ্চালন কিংবা বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত কী সংকট তৈরি করছে—সেটি আমরা আমজনতা কতটুকুই বা জানি। এর সঙ্গে অনেক কারিগরি ও প্রকৌশলগত বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো নিশ্চয়ই একবাক্যে বলা সম্ভব নয়। অথচ পুরো বিদ্যুৎ খাতের সংকট, ত্রুটিবিচ্যুতি কিংবা দুর্বলতাগুলো না জেনে একবাক্যে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে দোষারোপ করে মন্তব্য করা—সত্যিকার অর্থে পুরো সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে, মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টাকে খাটো করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সংসদের মতো একটি দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে এ ধরনের মন্তব্য কেবল অবিচার-অন্যায্যই নয়; বরং অসম্মানের। বিদ্যুৎমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কেবিনেটের একজন সিনিয়র সদস্য। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আবার বয়োজ্যেষ্ঠও। সংসদে সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হলে কারও আপত্তি থাকবে না। বিদ্যুৎ সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, এর নেপথ্যের প্রকৃত কারণ সবারই জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী হওয়ার কারণে সব দায় তাঁকে দিয়ে তীর্যক মন্তব্য করার অর্থ হলো—একজন সিনিয়র মন্ত্রীর প্রতি অবিচার করা। এটি চরম অপমানজনকও। এতে তিনি মর্মাহত হয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরকম মন্তব্য বেশ মুখরোচক ও ‘ভিউবর্ধনমূলক’ ঠিকই, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে অবশ্যই প্রকৃত কারণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এ লেখাটি লিখতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের নেপথ্যের কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় কেন এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে? এর পেছনে কি শুধু উৎপাদন ঘাটতি, নাকি বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও বড় কারণ? এসব কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো দীর্ঘ ওভারহেড বিদ্যুৎলাইন। গ্রামাঞ্চলে একটি ফিডারকে অনেক দূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমস্যা দেখা দিলে তা শনাক্ত করা এবং দ্রুত মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুৎ লাইনে বিভ্রাটের পেছনে প্রধানত চার ধরনের সমস্যার কথা জানা যায়। এগুলো হচ্ছে—পরিবেশগত প্রভাব, কারিগরি সীমাবদ্ধতা, ফল্ট শনাক্ত ও মেরামতে বিলম্ব, ওভারলোড ও যন্ত্রপাতি বিকল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বিদ্যুৎলাইন খোলা পরিবেশে স্থাপিত। অনেক ক্ষেত্রে ঝোপঝাড়, গাছপালা ও কৃষিজমির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ওভারহেড লাইন চলে গেছে। ঝড় বা প্রবল বাতাসে গাছের ডালপালা বিদ্যুৎলাইনের ওপর পড়ে শর্ট সার্কিট তৈরি করতে পারে। আবার বৃষ্টি, বজ্রপাত কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে পিন ইনসুলেটর, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ট্রিপ করতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ দীর্ঘ লাইনে সংঘটিত ফল্টের বড় অংশই সিঙ্গেল লাইন-টু-গ্রাউন্ড। প্রায় ৭৫ শতাংশ ফল্ট এই ধরনের হতে পারে, যার সঙ্গে গাছপালা, ইনসুলেটর লিকেজসহ পরিবেশগত কারণের সম্পর্ক রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভোল্টেজ ড্রপ। উপকেন্দ্র থেকে কোনো ফিডারের শেষ প্রান্তের দূরত্ব যত বেশি হয়, লাইনের শেষে ভোল্টেজ তত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ ফিডারের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় লোড কমানো বা লাইন ট্রিপ করার প্রয়োজন দেখা দেয়। অন্যদিকে, কোনো কোনো ফিডারে আধুনিক অটোমেটিক প্রোটেকশন ও রিক্লোজিং ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে লাইনের ছোট একটি অংশে ত্রুটি দেখা দিলেও পুরো ফিডার বা সাবস্টেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে একটি স্থানীয় ত্রুটি বড় এলাকার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে রূপ নিতে পারে। পল্লী বিদ্যুতের দীর্ঘ ফিডারে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো ফল্টের সঠিক স্থান শনাক্ত করা। কোনো কোনো ফিডারের দৈর্ঘ্য ৩০, ৬০, এমনকি ৮০-৯০ কিলোমিটার বা তারও বেশি হতে পারে। এ ধরনের লাইনের কোথাও গাছ পড়ে গেলে, ইনসুলেটর পাংচার হলে কিংবা অন্য কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সেটি খুঁজে বের করতে লাইনম্যানদের দীর্ঘ পথ পরিদর্শন করতে হয়। পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একটি সাধারণ বিভ্রাটের প্রথমে লাইনের কোনো দূরবর্তী অংশে শর্ট সার্কিট, গাছের ডাল স্পর্শ বা অন্য কোনো ত্রুটির কারণে লাইন ট্রিপ করে। এরপর লাইনম্যানদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ত্রুটির জায়গা শনাক্ত করতে হয়। এরপর গাছের ডাল কাটা, ইনসুলেটর পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা হয়। ত্রুটি মেরামতের পর সাবস্টেশন থেকে লাইন পুনরায় চার্জ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর শুধু একটি সুইচ টিপে সরবরাহ চালু করার সুযোগ সব ক্ষেত্রে থাকে না। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ ব্যবস্থার ওপর চাপও বেড়েছে। কোনো ট্রান্সফরমারের ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি লোড থাকলে সেটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। এতে ড্রপ-আউট ফিউজসহ বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প যন্ত্রপাতি পৌঁছানো সবসময় সহজ হয় না। স্পেয়ার পার্টসের মজুত, পরিবহনব্যবস্থা ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পল্লী বিদ্যুতের বিভ্রাটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় পর্যায়ের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি। দেশে জ্বালানি সংকট বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হলে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ পড়ে। একই সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বেশি থাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির প্রভাব পল্লী বিদ্যুতের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ওপরও পড়তে পারে। বর্তমানে পিজিসিবির মাধ্যমে ৩৩ কেভির বেশ কিছু ফিডারে এসসিএডিএ এবং আন্ডারফ্রিকোয়েন্সি রিলে স্থাপনের তথ্য রয়েছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবস্থাগুলো পুরো বিতরণ নেটওয়ার্কে সমানভাবে বিস্তৃত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ফল্ট শনাক্তকরণ সক্ষমতা বাড়ানো এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এখানেই সংসদের সাম্প্রতিক বিতর্ককে সস্তা মুখরোচক বিষয়ে না রেখে গভীরে যাওয়া উচিত। কারণ কোনো এলাকায় কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং হলে তাত্ক্ষণিক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু একটি দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুৎ লাইনে গাছ পড়ে যাওয়ার পর সেটি শনাক্ত করতে যদি কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, কিংবা একটি ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার পর নতুন যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে সময় লাগে—তাহলে সমস্যাটিকে শুধু মন্ত্রীর বক্তব্য বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে প্রকৃত চিত্রটি আড়ালে চলে যায়। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ফিডারের অতিরিক্ত দৈর্ঘ্য, পুরোনো বিতরণব্যবস্থা, জনবল ঘাটতি, যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং জাতীয় উৎপাদন সক্ষমতার মতো একাধিক বিষয় জড়িত। আর এতসব সমস্যা বিগত সরকারগুলোর কাছ থেকে বর্তমান সরকার প্রকৃতই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলেই তাঁকে দোষারোপ করার মধ্য দিয়ে একটি কাঠামোগত সংকটকে আড়াল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সত্যিকার অর্থে এতসব সমস্যা যেমন দূর করতে হবে তেমনি দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। মোটাদাগে, বিদ্যুৎ সংকটে শুধু সরকার বা বিদ্যুৎমন্ত্রীকে দোষারোপ নয়; বরং তা মোকাবিলায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। ভোক্তা হিসেবে জনগণ, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ দেশের সব স্টেকহোল্ডারকেই এ সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশে থাকতে হবে। অর্থনীতিতে যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, সেটি অস্বীকার করা যাবে না কিংবা বিদ্যমান সমস্যাগুলোও অগ্রাহ্য করা যাবে না। সবকিছু বিবেচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পল্লী বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না। উৎপাদনের পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও জরুরি। যেমন—আধুনিক স্মার্ট গ্রিড, অটোমেটিক রিক্লোজার এবং ফল্ট লোকেটর স্থাপন করা হলে লাইনের কোথায় ত্রুটি হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যানুয়াল পেট্রোলিংয়ের প্রয়োজন কমবে। দীর্ঘ ফিডারের সমস্যা কমাতে নতুন সাবস্টেশন ও উপকেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন। দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতে গ্রাহকসংখ্যা ও ফিডারের দৈর্ঘ্য বিবেচনায় নিয়ে জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার, ইনসুলেটর, ফিউজসহ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখতে হবে। জরুরি সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহের জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে রিজার্ভ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

মাদকমুক্ত সমাজের প্রত্যয়ে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানো এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বক্তারা। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে মাদকবিরোধী আলোচনা সভা, গুণীজন সম্মাননা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় তাঁরা এ কথা বলেন। ‘শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চাই আমাদের লক্ষ্য’ এবং ‘সংস্কৃতি একটি জাতির অতীত ও ভবিষ্যতের কথা বলে’—এই স্লোগান সামনে রেখে সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে ‘মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচা কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে এ আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আলোচনা সভার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গুণীজনদের সম্মাননা দেওয়া হয়। পরে সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিন্স সোহাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কল্পনা মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জুয়েল হালদার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি মীর হাসমত আলী। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আ ক ম মোজাম্মেল হক। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি পরিবারে সচেতনতা তৈরি, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল বারী এবং সারা হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক (মার্কেটিং) শেখ মো. শাহ কামাল (শ্যামল)। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, ব্যবসা ও মানবসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১০ জন গুণীজনকে ‘সোনার বাংলা সম্মাননা-২০২৬’ দেওয়া হয়। প্রধান অতিথি তাঁদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেন। সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলেন, এ ধরনের স্বীকৃতি তাঁদের ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করবে। পরে সংগঠনের শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গান, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

রিট খারিজ, গ্রামীণ কল্যাণকে দিতে হবে ৬৬৬ কোটি টাকা
পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচ করবর্ষের জন্য ৬০০ কোটির বেশি টাকা কর দাবি নিয়ে করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের পৃথক দুটি রিট খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের রাজস্ব হিসেবে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে অতিরিক্ত কর দাবি করে কর বিভাগ। ওই দাবির বৈধতা নিয়ে ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণসহ রায় দেন। ওই রায়ে কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে বিলম্ব মার্জনা করে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তে গ্রামীণ কল্যাণকে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথকভাবে লিভ টু আপিল করে। পরে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আপিল বিভাগ ওই আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করে গ্রামীণ কল্যাণের করা রিটের মূল বিষয়বস্তুর ওপর হাইকোর্টে পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। এরপর পুনঃশুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে রায় দেন। তবে একই বছরের ২৯ আগস্ট ওই রায় প্রত্যাহার করা হয়। আদালত জানান, ওই দ্বৈত বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক অতীতে এসব মামলায় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে তাঁর ওই মামলায় বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে রায়টি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে পাঠান। ওই বেঞ্চে পুনরায় শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রিট দুটি খারিজ করে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ বলেন, পাঁচ করবর্ষে গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা কর অনাদায়ি ছিল। কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা দুটি রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত রুল খারিজ করেছেন। ফলে সরকারের রাজস্ব হিসেবে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তিনি আরও জানান, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর কর বিভাগ ৩০ দিনের সময় দিয়ে দাবি আদায়ের জন্য ডিমান্ড নোটিশ জারি করবে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবির বিরুদ্ধে রিট দুটি করা হয়েছিল। আদালত রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি বিস্তারিত জানা যাবে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আপিল করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, সরদার জিন্নাত আলী ও আবদুল্লাহ আল মামুন শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদ।

গাড়ি-মোটরসাইকেল কেনাবেচায় নতুন মার্কেটপ্লেস ‘সুপার সেল কার বাজার’
রাজধানীতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল কেনার পাশাপাশি নিজের ব্যবহৃত যানবাহন বিক্রি করতে আগ্রহীদের জন্য নতুন একটি মার্কেটপ্লেস হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। গত ৪ সেপ্টেম্বর আইসিসিবিতে প্রথমবারের মতো এই আয়োজন শুরু হয়। উদ্বোধনী আয়োজনের পর এখন থেকে প্রতি শুক্রবার সেখানে বসবে এই কার বাজার। আয়োজকেরা বলছেন, ব্যস্ত নগরজীবনে গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্য সময় ও ঝামেলা কমাতেই এই উদ্যোগ। একই জায়গায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের যানবাহন দেখার সুযোগ থাকায় ক্রেতারা নিজেদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী পছন্দের যানবাহন বেছে নিতে পারবেন। ‘সুপার সেল কার বাজারে’ নতুন, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির পাশাপাশি মোটরসাইকেল এবং ইউটিলিটি ভেহিকেল প্রদর্শন ও কেনাবেচার ব্যবস্থা থাকছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবহৃত যানবাহনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ডিলারও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। উদ্যোক্তাদের মতে, দেশে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য একটি নিয়মিত ও আধুনিক বাজারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। এই আয়োজনের মাধ্যমে এক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন দেখার, তথ্য জানার এবং তুলনা করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ডিলারশিপ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অটোমোবাইল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল বিশেষ ছাড়ে কেনাবেচার সুযোগও থাকছে। ‘সুপার সেল কার বাজার’ আয়োজন করছে উইজার্ড শোবিজ। এর ভেন্যু পার্টনার হিসেবে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি)। প্রতি শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে এই আয়োজন চলবে।

লোডশেডিংয়ের দায় কি শুধু বর্তমান সরকারের
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট বেশি। কিন্তু বাস্তবে সব কেন্দ্র থেকে একসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, কয়লা ও তেল সরবরাহের ঘাটতি, অর্থসংকটসহ নানা কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে অথবা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে। ফলে স্থাপিত সক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭০টির বেশি কেন্দ্র কোনো না কোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে গিয়ে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহে। দেশের বেশ কয়েকটি বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ এর চেয়ে কয়েক শ মিলিয়ন ঘনফুট কম থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। গত কয়েক বছরে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকায় বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ বেড়েছে। একই সময়ে আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় এই নির্ভরতার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও জ্বালানি সরবরাহ বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পায়রা ও রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে বিপুল পরিমাণ কয়লা প্রয়োজন। বকেয়া বিল পরিশোধে সমস্যা তৈরি হলে কয়লা আমদানি ও সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হয়। এতে উৎপাদন কমে যায়। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হলে জ্বালানি সংগ্রহ করে আরও কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। কোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখার বিপরীতে নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়। বিদ্যুৎ খাতের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে কেন্দ্র স্থাপনের সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের ফলে রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এসব চুক্তি করা হয়েছিল। ২০০৯ সালের পর দেশে বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত মোকাবিলায় কুইক রেন্টাল ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের লক্ষ্য ছিল স্বল্প সময়ে উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি কমানো। এ জন্য বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়। এর আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু প্রক্রিয়া শিথিল করা হয়েছিল। পরে এই ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুক্তিতে বিশেষ ব্যবস্থায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার ফলে বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে রাষ্ট্রের ব্যয় বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামো তৈরির সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন সচিব আবুল কালাম আজাদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা নসরুল হামিদও দীর্ঘ সময় এ খাতের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সমালোচকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের নীতির ধারাবাহিকতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি সরবরাহ, সঞ্চালনব্যবস্থা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি হয়নি। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত ভিত্তি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, স্বজনদের ব্যবসায়িক সুবিধা দেওয়া এবং সম্পদ অর্জনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প এবং বিভিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে মিটার স্থাপন, গ্রাহকসেবা প্রযুক্তি, নেটওয়ার্ক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, মালিকানা কাঠামো, সরকারি অনুমোদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো প্রয়োজন। নসরুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা এবং অর্থ পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে তাঁদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বিদেশে কোনো সম্পদ থাকা মানেই তা অবৈধভাবে অর্জিত বা পাচারের অর্থে কেনা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের নথি, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব ও পরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করা আহমদ কায়কাউসের সময়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না থাকায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগেই তৈরি হয়েছে। বর্তমান লোডশেডিংকে শুধু বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। একইভাবে অতীত সরকারের সব সিদ্ধান্তকেও বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে—গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানির সমস্যা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, সেই সক্ষমতার বড় অংশ এখন কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়; ভবিষ্যতের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি আমদানির বহুমুখীকরণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন, চুক্তিতে স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প ব্যয়ের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও যদি জ্বালানি না থাকে, কেন্দ্র চালু রাখা না যায় কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে, তাহলে কাগজে থাকা হাজার হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা সাধারণ মানুষের ঘরে আলো জ্বালাতে পারবে না। বর্তমান লোডশেডিং তাই শুধু সাময়িক বিদ্যুৎ ঘাটতির ঘটনা নয়; এটি গত দেড় দশকের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, বিনিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, এজলাস ছাড়লেন পাঁচ বিচারক
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারকাজ চলাকালে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার সকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারিক কার্যক্রম চলার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্য দেন এবং আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে তাঁর বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। বার সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলার শুনানির গতি কমে গেছে। তাঁর দাবি, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতির সমন্বয়ে তিনটি বেঞ্চ সক্রিয় থাকলেও বর্তমানে একটি বেঞ্চ কার্যকর রয়েছে। এতে মামলার শুনানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার সময় বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিচারিক কার্যক্রমের ধীরগতির প্রভাব আইনজীবীদের পেশাগত কাজেও পড়ছে বলে মন্তব্য করেন বার সভাপতি। বিশেষ করে সাধারণ ও জুনিয়র আইনজীবীরা নিয়মিত মামলা শুনানির সুযোগ না পাওয়ায় তাঁদের পেশাগত কাজ ও আয় কমে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। চেম্বার আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও অভিযোগ করেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। তাঁর ভাষ্য, চেম্বার আদালত কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ বা ইনজাংশন দেওয়ার পর সেটি আপিল বিভাগে শুনানির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এসব আদেশ বহাল থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সমস্যায় পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সম্প্রতি তথ্য গোপনের অভিযোগে একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন বার সভাপতি। তাঁর মতে, ওই আইনজীবীর ওপর আরোপ করা জরিমানা অত্যধিক কঠোর হয়েছে। তিনি আদালতের কাছে ওই আইনজীবীকে ক্ষমা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন বলেও জানান। তবে আদালত সেই অনুরোধ গ্রহণ করেনি বলে তাঁর দাবি। এ ছাড়া আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় জরুরি কোনো মামলা বা বিষয়ে বিচারপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আইনজীবীদের ‘মেনশন’ করার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। এ সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কোর্টসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, মঙ্গলবার সকালে আপিল বিভাগে বিচারকাজ চলার সময় এসব বিষয় নিয়ে বার সভাপতি সরাসরি কথা বলতে শুরু করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রধান বিচারপতি ও তাঁর নেতৃত্বাধীন অপর চার বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় চলে যান বলে সূত্রটি জানায়। সুপ্রিম কোর্টের সর্বোচ্চ আদালতে এমন পরিস্থিতির ঘটনায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আপিল বিভাগে বিচারিক কার্যক্রম, বেঞ্চের সংখ্যা, ‘মেনশন’ করার সুযোগ এবং জুনিয়র আইনজীবীকে জরিমানাসহ বার সভাপতির উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বিচারপতি কিংবা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মায়ের বিদায়ে অশ্রুসিক্ত লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল
মায়ের কথা বলতে গিয়ে লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল বলেন, ‘যেখানেই থাকতাম, প্রতিদিন মায়ের কাছে হাজিরা দিতাম।’ মায়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তাঁর। মায়ের স্নেহের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মা তাঁকে সব সময় আদর করতেন, ভালোবাসতেন। কাছে পেলে স্নেহভরে চুমু দিতেন। সেই মমতাময়ী মানুষটি আজ আর তাঁদের মধ্যে নেই—এই বাস্তবতা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। জানাজার আগে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল। তিনি বলেন, তাঁর মায়ের কোনো কথা বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে যেন তাঁকে ক্ষমা করে দেন। মায়ের স্মৃতি মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই।’ তাঁর কথায় ফুটে ওঠে মাকে হারানোর গভীর শোক এবং শূন্যতার অনুভূতি। মায়ের জীবনের কথা স্মরণ করে লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল জানান, তাঁর মা হজ ও ওমরাহ পালন করেছেন। মহান আল্লাহ যেন তাঁর জীবনের সব ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন—এ জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন তিনি। মায়ের মৃত্যুতে গভীর শোকের মধ্যে থাকা লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল মায়ের রেখে যাওয়া সব পাওনা ও দায়দায়িত্বের বিষয়েও দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। চার ভাইকে একসঙ্গে রেখে মায়ের যে ভূমিকা, সেই অবদানের কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। মায়ের প্রতি সন্তানের এমন গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার স্মৃতিচারণে জানাজায় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সবার কাছে ফরিদা বেগমের রুহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া কামনা করেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন মরহুমার দৌহিত্র, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল, মরহুমার ছেলে ও রূপায়ণ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আলী আকবর খাঁন রতন, মরহুমার দৌহিত্র ও রূপায়ণ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফ আলী খাঁন অতুলসহ পরিবারের সদস্যরা। ফরিদা বেগমের মৃত্যুতে রূপায়ণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ ও সামাজিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। রাতেই হাসপাতালে ছুটে যান। জানাজা এবং দাফনেও শরিক হন অনেকেই। এ সময় মরহুমার বড় ছেলে রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুলসহ পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের সান্ত্বনা দেন তারা। একইসঙ্গে ফরিদা বেগমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। ফরিদা বেগমের মৃত্যুতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মাছরাঙা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, দেশ রূপান্তরের সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি ও কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন। তা ছাড়া ঢাকা ক্লাব লিমিটেড, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব), অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শোক প্রকাশ করেছে। ফরিদা বেগমের জানাজায় শরিক হয়ে সমবেদনা জানান দৈনিক আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন, রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, স্থপতি রফিক আজম, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল্লাহ আল মামুন, অভিনেতা নাদের চৌধুরী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। জানাজায় রূপায়ণ গ্রুপের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা চাইলেন
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত নদী ও পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে সচিবালয়ে রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, নাব্যতা নিশ্চিতকরণ এবং বৃত্তাকার নৌপথের উন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা সভায় এই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও দূষণমুক্ত নদী ও একটি বাসযোগ্য পরিবেশ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য শুধু সরকারি নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করলে হবে না, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ থেকেও কাজ করতে হবে। সভায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী এবং তৎসংলগ্ন খাল ও ড্রেনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ, নদ-নদীর নাব্যতা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং ঢাকার চারপাশে বিদ্যমান বৃত্তাকার নৌপথের উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় এ পর্যন্ত গৃহীত পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

রাজনীতিতে ‘ডিসেম্বর’—সরকার পতনের সময়সীমা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ যাঁদের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেয়, সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তাঁরাই রাষ্ট্রের বৈধ সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে আবার নির্বাচন হয় এবং ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে সরকারের নীতি, কর্মকাণ্ড কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিবাদে রাজপথে আন্দোলন করাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। বিরোধী দল ও নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা এবং দাবি আদায়ে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। প্রশ্ন তৈরি হয় তখনই, যখন নির্বাচনের বাইরে রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী পদযাত্রা এই বিতর্ককে সামনে এনেছে। দীর্ঘ সড়কজুড়ে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি এবং সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ছয় দফা দাবির মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার মতো বিষয় রয়েছে। এসব দাবির অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সরকারকে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দাবিগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং সেই দাবিকে কেন্দ্র করে সরকার পরিবর্তনের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়েই মূল বিতর্ক। বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসমাগম কোনো দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও মাঠের শক্তির পরিচয় দিতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের জনমত নির্ধারণ করা যায় না। কারণ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত দেন। রাজপথের আন্দোলন এবং নির্বাচনের ভোট—দুটিই গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু তাদের ভূমিকা এক নয়। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে কোনো দাবি মানতে চাপ দেওয়া যেতে পারে; অন্যদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ নির্ধারণ করেন কে সরকার পরিচালনা করবেন। এই দুইয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদের ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের বক্তব্যের পর ‘ডিসেম্বর’ এখন রাজনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বানও ছিল। অন্যদিকে এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলাম ছয় দফা দাবিকে এক দফায় রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে কর্মসূচিতে আলোচনা হয়েছে। আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও এসেছে জোটের নেতাদের কাছ থেকে। এ অবস্থায় ডিসেম্বরের সময়সীমা বাস্তবে কী অর্থ বহন করছে, সেটিই এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এটি কি সরকারকে চাপ দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল, নাকি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বক্তব্যে ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটির ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, নাগরিক সেবা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কিংবা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের অসন্তোষ থাকতেই পারে। এসব বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করাও স্বাভাবিক। তবে সরকারের কোনো নীতি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে সরাসরি ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ফ্যাসিবাদ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধারণা। রাজনৈতিক বিতর্কে শব্দটির অতিরিক্ত ব্যবহার হলে এর অর্থ ও গুরুত্ব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে যারা কর্তৃত্ববাদ বা প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলছেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীন রাখবেন—সেটিও জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে। জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া দলটির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে হলে দলটিকে রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির প্রশ্নে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। অন্যদিকে জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠে আসা এনসিপি শুরু থেকেই প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছে। পরিবারতন্ত্র, দখলদারিত্ব ও প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও তাদের বক্তব্যে এসেছে। এখন জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একই কর্মসূচিতে এনসিপির অংশগ্রহণের ফলে তাদের ‘নতুন রাজনীতি’র অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক জোট ও কৌশল পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও সেই পরিবর্তন তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। অতীতে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নানা বিতর্ক সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে একটি দেশের সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল সিদ্ধান্ত দেশের জনগণের হাতেই থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা, আন্দোলন, নির্বাচন ও ক্ষমতার পরিবর্তন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হওয়া প্রয়োজন দেশের নাগরিকদের মতামত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ডিসেম্বরকে ঘিরে অলি আহমদের দেওয়া সময়সীমা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকার পরিবর্তনের পথটি কী হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের জয়-পরাজয় একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বিরোধী দল আন্দোলন করবে, সরকারের সমালোচনা করবে এবং জনগণের সমর্থন চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। একইভাবে জনগণ নির্বাচনের সময় ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের দল বা প্রার্থীকে বেছে নেবেন। তাই রাজপথে বড় সমাবেশ যেমন রাজনৈতিক শক্তির প্রকাশ, তেমনি ভোটের বাক্সও জনমতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। রাজপথের আন্দোলন যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রতিস্থাপন করে, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই ‘ডিসেম্বর’ কেবল একটি সম্ভাব্য সময়সীমার নাম নয়; এটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কে? জনগণ ও তাদের ভোট, নাকি রাজপথের রাজনৈতিক শক্তি? গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সন্ত্রাসবাদ আর পানি—ভারত কেন দুটিকে একসঙ্গে দেখছে
একটি চুক্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে? আর দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন ঘটলে সেই চুক্তির সুবিধা কি আগের মতো বহাল রাখা সম্ভব? ভারত-পাকিস্তানের ৬৬ বছরের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে এখন এই প্রশ্নগুলোই সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ভারত এ হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের দায়ী করে। এর পরই নয়াদিল্লি ঘোষণা দেয়, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য ও অপরিবর্তনীয়ভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত থাকবে। ভারতের এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু পানি বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের অবনতিকে তারা অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখতে চাইছে না। সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এবার আন্তর্জাতিক আইনি পরিসরেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পর চুক্তির আওতায় গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত রায় দেয়, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো কার্যকর। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করা যায় না বলেও আদালত মত দেয়। একই সঙ্গে ভারতের রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কিছু অন্তর্বর্তী বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাকিস্তান এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারা ওই সালিসি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে রায় দেওয়ার এখতিয়ারও ওই ট্রাইব্যুনালের নেই বলে মনে করে দেশটি। এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধ এখন কেবল পানি বণ্টন বা প্রকল্প নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকট। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারে ভারত অধিকতর অধিকার পায়। একই সঙ্গে উভয় দেশকে নির্দিষ্ট শর্তে একে অপরের নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধ চললেও এই চুক্তি দীর্ঘ সময় কার্যকর ছিল। সে কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে এটিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সফল পানি সহযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবেও দেখা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই। দুই দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, পানির চাহিদা বেড়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ভারতের অবস্থানকে সরলভাবে দেখলে মনে হতে পারে, একটি সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় একটি পানি চুক্তি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু নয়াদিল্লির যুক্তি এর চেয়ে বিস্তৃত। ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। মুম্বাই, উরি, পুলওয়ামা ও সর্বশেষ পাহেলগাম হামলার মতো ঘটনাগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার সংকটের মধ্যে ফেলেছে। পাকিস্তান অবশ্য ভারতের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ভারতের দৃষ্টিতে, পাহেলগাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের ধারাবাহিকতার অংশ। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পানি, বাণিজ্য বা অন্যান্য সহযোগিতাকে নিরাপত্তা সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখার পুরোনো নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে নয়াদিল্লি। এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সন্ত্রাসী হামলা ঘটলেই কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়—এমন কোনো সরল আইনি নিয়ম নেই। ভারতও চুক্তিকে চিরতরে বাতিল করার কথা না বলে স্থগিত রাখার কথা বলছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে সহযোগিতার পথ আবার খোলার সুযোগ তারা রাখছে। আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রকে তা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতার জন্য এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আন্তর্জাতিক আইন সব পরিস্থিতিকে এক রকমভাবে দেখে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত, পরিবর্তন বা বাতিলের কিছু আইনি ভিত্তিও রয়েছে। গুরুতর চুক্তিভঙ্গ কিংবা পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের মতো বিষয় আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব রাজনীতিতেও দেখা গেছে, জাতীয় নিরাপত্তা বা পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতার কারণে রাষ্ট্রগুলো পুরোনো চুক্তি থেকে সরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে করা অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে ২০১৯ সালে রাশিয়ার সঙ্গে করা আইএনএফ চুক্তি থেকেও সরে আসে ওয়াশিংটন। এসব সিদ্ধান্তের আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এগুলো দেখায়, রাষ্ট্রগুলো সব সময় চুক্তিকে পরিবর্তিত বাস্তবতার ঊর্ধ্বে রাখে না। নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন ঘটলে পুরোনো প্রতিশ্রুতি নতুন করে মূল্যায়নের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রয়েছে। সিন্ধু নদ অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি, সেচব্যবস্থা এবং অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে সিন্ধু পানি চুক্তি শুধু দুই দেশের মধ্যে একটি সাধারণ পানি বণ্টন চুক্তি নয়। পাকিস্তানের কাছে এটি দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ভারত চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তানের উদ্বেগ তাই স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। অন্যদিকে ভারত বলছে, চুক্তির সুবিধা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আর আলাদা করে দেখার মতো অবস্থায় দুই দেশের সম্পর্ক নেই। দ্য হেগের সালিসি আদালতের রায় আইনি বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। আদালত চুক্তিকে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের আইনি প্রভাব নিয়ে অবস্থান জানিয়েছে। কিন্তু এই রায় দুই দেশের রাজনৈতিক অবিশ্বাস দূর করতে পারবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বর্তমান সংকট শুধু একটি চুক্তির ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাশ্মীর এবং পারস্পরিক আস্থার গভীর সংকট। ভারতের অবস্থান হলো, পানি সহযোগিতা আবার স্বাভাবিক করতে হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও উন্নতি প্রয়োজন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য সিন্ধু পানি চুক্তির ধারাবাহিকতা পানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে না। এর সঙ্গে দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত যদি মনে করে পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে, তাহলে চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দূর করার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। চুক্তিটি একসময় যুদ্ধ ও বৈরিতার মধ্যেও দুই দেশকে পানি সহযোগিতার একটি কাঠামোর মধ্যে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। পানি বণ্টনের নিয়ম হয়তো চুক্তিতে নির্ধারিত। কিন্তু সেই চুক্তি কার্যকর রাখার জন্য যে রাজনৈতিক আস্থা প্রয়োজন, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ তাই শেষ পর্যন্ত শুধু পানির প্রশ্ন নয়। এটি ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা নীতি এবং পারস্পরিক আস্থারও একটি পরীক্ষা।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান, অন্য উপদেষ্টাদের নিয়েও প্রশ্ন
একটি সরকারের পতন বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন একের পর এক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এসবের কতটা সত্য? সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি জানান। এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুধু একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তই শুরু হলো না; একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে। দুদকের কাছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি অংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগে ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই অর্থ যদি সত্যিই লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে অর্থের উৎস ও গন্তব্য কোথায়? কার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির নথিতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না? দুদকের অনুসন্ধানেই এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং বিদেশে সম্পদ রাখার মতো বিষয়। তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নথিপত্র, ব্যাংক হিসাব, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টাকে দিতে হতো—এমন অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এই কমিশন-সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারক করতেন। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, বরাদ্দ, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল পরিশোধ এবং অর্থ ছাড়ের নথি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নিয়োগের জন্য মোট ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল-আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাঠানো এবং ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এমন কোনো অর্থ লেনদেনের আর্থিক প্রমাণ আছে কি না। ব্যাংক হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক বিবরণী এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগটির সত্যতা বা অসত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০ কোটি টাকা নগদ এবং সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ১০ শতাংশ কমিশনের শর্তে নিয়োগটি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এজাজের বিরুদ্ধে পশুর হাট ইজারা, ই-রিকশা প্রকল্প, সম্পত্তি ও দোকান বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তের ক্ষেত্রে তাই শুধু নিয়োগের সময়কার সিদ্ধান্ত নয়, পরবর্তী সময়ে প্রশাসক হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে এবং কথিত প্রেস সেক্রেটারি বিভিন্ন টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এখানে তদন্তের জন্য একটি বড় প্রশ্ন—কোন কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যাদেশ পেয়েছে? প্রতিটি টেন্ডারের দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, কার্যাদেশ, বিল পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বিশ্লেষণ করলে কোনো সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের অস্তিত্ব থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়েও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সারাদেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩৬ জনকে পরবর্তীতে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, জেলা অনুযায়ী ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে—কোন কর্মকর্তার পক্ষে কখন ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে, সেই কর্মকর্তা কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক অবস্থানে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটেছে কি না—তা পর্যালোচনা করা। আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব প্রকাশের পর তার সম্পদ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ক্রিপ্টোকারেন্সি, দুবাইয়ে বিনিয়োগ এবং সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক হিসাব থাকার দাবিও সামনে আসে। এসব দাবির সত্যতা এখনো আলাদা করে প্রমাণিত নয়। তবে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে তার সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেশীয় ও বিদেশি সম্পদের উৎস যাচাই করা দুর্নীতি অনুসন্ধানের স্বাভাবিক অংশ। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশিদের মোট জমা অর্থকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে ব্যক্তি-নির্দিষ্ট আর্থিক তথ্য। দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত যদি সত্যিই বিস্তৃত হয়, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ডও এর বাইরে থাকার কথা নয়—এমন দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি অনুমোদন এবং বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে গ্রামীণ আমেরিকায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ বাড়ার কথাও বলা হয়েছে। এখন তদন্তের প্রশ্ন—এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে? বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্রে অর্থের উৎস কী দেখানো হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নথিপত্রের মাধ্যমেই বের করা সম্ভব। ইউনূস সরকারের সময়ে গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমোদন—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের কর সুবিধা এবং ব্যাংকে সরকারের শেয়ারের হার ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের প্রধান ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সাব-রেজিস্ট্রার বদলি। অভিযোগকারীদের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ভালো কর্মস্থলে বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত এবং সাধারণ বদলির ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের দাবিও রয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো—এত বিপুল সংখ্যক বদলির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং বদলির আগে-পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারীর যোগাযোগ ছিল কি না। ২০২৫ সালের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের একটি চক্র কাজ করেছে এবং এর সঙ্গে আসিফ নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল। অভিযোগে কয়েক শ কোটি টাকা লেনদেনের দাবিও করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে বিচারকদের বদলির সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন আসামির জামিন নিশ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এই অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট মামলার তথ্য সামনে আনতে হবে। কোন মামলায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, কে আইনজীবী ছিলেন, কার মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন ঘটেছে কি না—এসবই তদন্তের বিষয় হতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে ২৫২টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে রিক্রুটিং লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কি নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল? লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কাজ করেছে কি না? কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না? লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকেও ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের একটি অংশে দাবি করা হয়, আবু বকর সিদ্দিকীর সঙ্গে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দীর্ঘদিনের পরিচয় ও পেশাগত সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক লেনদেনে মধ্যস্থতার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ছাড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর রিজওয়ানা হাসান ও তার পরিবারের সম্পদ বেড়েছে—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হবে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল। শুধু আসিফ মাহমুদ, আসিফ নজরুল কিংবা রিজওয়ানা হাসান নন—ইউনূস সরকারের আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ থাকার দাবি করা হয়েছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি রয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে একই নীতি প্রযোজ্য—অভিযোগ থাকলেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না। আবার অভিযোগ থাকার কারণে তদন্ত না করাও জবাবদিহির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া তাই একটি বড় প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে—অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ের দুর্নীতির অভিযোগগুলো কি একইভাবে যাচাই করা হবে? সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে উপদেষ্টা, আমলা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি—কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তের ভিত্তি হতে হবে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তথ্য ও প্রমাণ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে তাকেও দায়মুক্তি দিতে হবে। জনগণের স্বার্থে তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও স্বাধীন তদন্ত—যেখানে নিয়োগ-বদলি, পদায়ন, টেন্ডার, উন্নয়ন প্রকল্প, বিদেশি সম্পদ, অর্থপাচার এবং সরকারি সুবিধা প্রদানের প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছিল কি না। আর সেই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বেরিয়ে আসতে হবে তদন্তের নথি ও প্রমাণ থেকে।

ব্যাংকিং সেবা স্বাভাবিক করতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের একাধিক উদ্যোগ
দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতার পর গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আবেদুর রহমান সিকদার জানিয়েছেন, গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন ব্যাংকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, একজন গ্রাহক প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে রাখেন। সেই অর্থ প্রয়োজনের সময় দিতে না পারা ব্যাংকারদের জন্যও কষ্টের। এ কারণে গ্রাহকদের স্বাভাবিক লেনদেনের সুযোগ নিশ্চিত করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যক্তি পর্যায়ের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের গ্রাহকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে পারছেন। এমনকি কোনো গ্রাহক চাইলে তাঁর হিসাবের পুরো স্থিতিও তুলে নিতে পারবেন। পাশাপাশি মাসিক মুনাফাভিত্তিক হিসাবের গ্রাহকদের নিয়মিত মুনাফা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেয়াদি আমানত, ডিপিএস ও মাসিক স্কিমের গ্রাহকেরা ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে না চাইলে মূল আমানত ফেরত নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির এমডি। স্বাভাবিক লেনদেনের সুযোগ পাওয়ার পর অনেক গ্রাহক তাঁদের পুরো অর্থ তুলে নেবেন—এমন ধারণা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ছিল। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হয়েছে বলে জানান আবেদুর রহমান সিকদার। তাঁর মতে, অনেক গ্রাহক অর্থ ব্যাংকে রেখেই লেনদেন চালিয়ে যেতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। নিয়মিত মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। ব্যাংকটির জন্য এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন তিনি। দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেসব গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের আস্থা ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন ব্যাংকটির এমডি। তিনি বলেন, আগে কোনো গ্রাহক শাখায় এলে তাঁকে কীভাবে সেবা দেওয়া হবে, তা নিয়ে কর্মীদের মধ্যেও এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছিল। এখন লেনদেনের সুযোগ বাড়ায় কর্মীদের মধ্যে কাজের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসও বেড়েছে। ব্যাংকটির প্রবাসী গ্রাহকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন আবেদুর রহমান সিকদার। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত কয়েকজন গ্রাহক ফোন ও বার্তার মাধ্যমে তাঁদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন বলে জানান তিনি। অনেক প্রবাসী গ্রাহক তাঁদের অর্থ তুলে নিতে চান না, বরং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চান বলে জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কমে আসায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আবেদুর রহমান সিকদারের ভাষ্য, ব্যাংকে অর্থ রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করা। জরুরি প্রয়োজনে যথাযথ বিবেচনার ভিত্তিতে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ব্যক্তি পর্যায়ের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে বর্তমানে জমা ও উত্তোলনে আগের মতো বাধা নেই। পাশাপাশি নতুন হিসাব খোলার সুযোগও রয়েছে। কোনো গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে চাইলে তাঁর মূল আমানত ফেরত নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংকটির এমডির আশা, এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকের কার্যক্রম আরও স্বাভাবিক হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা শক্তিশালী হবে। ব্যক্তি পর্যায়ের লেনদেন স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে খুচরা ব্যাংকিং, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং করপোরেট খাত। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ব্যবসায়িক গ্রাহক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন বাড়িয়েছেন। এখন তাঁদের আবার ব্যাংকটির সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, প্রথম পর্যায়ে পুরোনো ও বিশ্বস্ত গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগে যেসব গ্রাহক ব্যাংকটির সঙ্গে বড় পরিসরে ব্যবসা করতেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনার পর নতুন গ্রাহক আকর্ষণের দিকে নজর দেওয়া হবে। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে বড় মূলধনভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। গ্রাহকদের সমন্বিত সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে রাজধানীর গুলশানে একটি মডেল শাখা চালুর পরিকল্পনা করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির এমডি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শাখাটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই শাখা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব পরিচয়ে পরিচালিত হবে। আগের পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকেরাও এখান থেকে সেবা নিতে পারবেন। আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, একই শাখা থেকে আগের পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার ধারণা থেকেই মডেল শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কাছাকাছি স্থানে আগের ব্যাংকগুলোর একাধিক শাখা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন ও কার্যক্রম বিবেচনায় এসব শাখাকে সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। গুলশানের মডেল শাখাকে সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এ ধরনের শাখার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে ব্যাংকটির। বিদ্যমান শাখা, উপশাখা, এটিএম নেটওয়ার্ক ও কর্মীদের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবেদুর রহমান সিকদার। তিনি বলেন, গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকের ভেতরে সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকের কর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আবেদুর রহমান সিকদারের মতে, আর্থিক খাতে আস্থা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ে। ব্যাংকের শাখা ও সেবা বিস্তারের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর ও মানসম্মত ব্যাংকিং সেবা চালুর মাধ্যমে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি, যার সঙ্গে লেনদেন করে গ্রাহকেরা এবং কাজ করে কর্মীরা সন্তুষ্ট ও গর্বিত বোধ করবেন। দীর্ঘদিনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ব্যাংকের সঙ্গে থাকা গ্রাহকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের আস্থাকে ভিত্তি করেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাঁরা।

বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজের স্বীকৃতি পেলেন ইয়াশা সোবহান
বিশেষ শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন ও অটিজম বিষয়ে দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মাদার তেরেসা ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ পেয়েছেন সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের ভাইস চেয়ারম্যান, বসুন্ধরা গ্রুপের পরিচালক ও বসুন্ধরা স্পেশাল চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়াশা সোবহান। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, যত্ন, থেরাপি ও সামগ্রিক বিকাশে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইয়াশা সোবহানকে ‘মাদার তেরেসা ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ দেওয়া হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) ঢাকার একটি স্বনামধন্য হোটেলে সার্ক কালচারাল ফোরাম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘আউটস্ট্যান্ডিং কন্ট্রিবিউশন টু অটিজম’ বিভাগে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। বসুন্ধরা স্পেশাল চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ইয়াশা সোবহান বিশেষ শিশুদের শিক্ষা ও যত্নের পাশাপাশি তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছেন। অটিজম ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করে বসুন্ধরা স্পেশাল চিলড্রেন ফাউন্ডেশন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৬০০-এর বেশি বিশেষ শিশুর শিক্ষা ও বিকাশ নিয়ে কাজ করছে। শিশুদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় শিক্ষা, থেরাপি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে ফাউন্ডেশনটি। ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন ইয়াশা সোবহান। বিশেষ শিশুদের নিয়ে কাজের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণেও তাঁর বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ রয়েছে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তায় তিনি থ্যালাসেমিয়া নিরাময় সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বিনা সুদে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগও রয়েছে তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে। সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের নেতৃত্বের দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগেও ইয়াশা সোবহান যুক্ত রয়েছেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন তিনি। অটিজম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কল্যাণে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এবারের পুরস্কার তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। একই সঙ্গে বিশেষ শিশুদের শিক্ষা, থেরাপি, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বসুন্ধরা স্পেশাল চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমও এ সম্মাননার মাধ্যমে সামনে এসেছে।

ঢাকার যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন, ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঢাকা মহানগরীর চলমান যানজট পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফ্লাইওভারে যানবাহনের চাপ, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা, বাস টার্মিনাল পুনর্বিন্যাস, পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাগুলোতে ETC (Electronic Toll Collection) সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর মাধ্যমে টোল আদায় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে একটি অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।