বিভাগ: অর্থনীতি
মোট খবর: 28 টি
ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে, বিপাকে ছোট ও মাঝারি আবাসন প্রতিষ্ঠান
দেশের আবাসন খাতে একদিকে নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে উচ্চ সুদে গৃহঋণ ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকট—সব মিলিয়ে গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা বাড়ার পাশাপাশি চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও থমকে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে, সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ পরিস্থিতিতে আবাসন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশে নামানো, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। তাঁর আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল আবাসন খাতের বর্তমান সংকট, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন সহজলভ্য করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, আবাসনকে কেবল ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ক্রেতারা কয়েক বছর আগে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেন এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। চুক্তি করার পর নির্মাণসামগ্রীর দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকে। এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কিছু আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন এ ধরনের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। এরই মধ্যে কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমেছে। ফ্ল্যাটের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, মানুষের ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে। তিনি বলেন, উচ্চ সুদে গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। ড. আলী আফজালের ভাষ্য, করোনাকাল থেকেই আবাসন খাতের সংকট বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগ করা অর্থ এবং অর্জিত মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। আবাসন খাতের সংকট শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা বা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প জড়িত বলে জানান রিহ্যাব সভাপতি। এসব শিল্পের পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতা আবাসন খাত। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব পণ্যের চাহিদা ও বিক্রিও কমে যায়। তিনি বলেন, নির্মাণ কার্যক্রম সংকুচিত হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন ও বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হতে পারে। এভাবে আবাসন খাতের মন্দা বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। ড. আলী আফজালের দাবি, দেশের আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়া ও নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই বলে জানান তিনি। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর ও ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে এই অতিরিক্ত অর্থ যোগ হওয়ায় অনেক ক্রেতার জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেন। প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন রিহ্যাব সভাপতি। জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়, যার চূড়ান্ত চাপ বহন করতে হয় ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের। মধ্যবিত্তের আবাসন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণের সুদ কমানো গেলে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য বাড়বে এবং আবাসন খাতেও নতুন করে চাহিদা তৈরি হবে। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে আরও কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির সময়ে স্বল্প সুদে অর্থায়ন পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান প্রকল্প শেষ করতে এবং নতুন প্রকল্প হাতে নিতে উৎসাহিত হবে। ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ খাতকে শুধু মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে নীতিসহায়তা দেওয়া উচিত। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, নতুন আবাসন গড়ে তুলতে নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অব্যবহৃত সরকারি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি জমি ব্যবহারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও বিনিয়োগ যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক আবাসন পরিকল্পনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। কর্মস্থলে যাতায়াতের সুবিধা বাড়লে ঢাকার বাইরে বসবাসের আগ্রহ বাড়বে এবং রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কমতে পারে। আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে সরকারের কার্যকরভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের বিষয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুফল প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, নির্মাণ ব্যয়, গৃহঋণের সুদ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয়—এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। রিহ্যাব সভাপতির মতে, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন। পরিকল্পিত নীতিসহায়তা ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের মাধ্যমে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজারে চাহিদা বাড়বে, সংযুক্ত শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

আইসিসিবিতে বৃষ্টির মধ্যেও জমে উঠেছে কার বাজার
রাজধানীতে টানা বৃষ্টির মধ্যেও থেমে থাকেনি গাড়ি কেনাবেচার আয়োজন। ক্রেতা-বিক্রেতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) এক্সপো ভিলেজে জমে উঠেছে সুপার সেল কার বাজার। প্রতি শুক্রবার আয়োজিত এ বাজারের ষষ্ঠ পর্বেও ছিল ব্যাপক মানুষের সমাগম। ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহের কারণে আয়োজনের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। উইজার্ড শোবিজ ও আইসিসিবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বাজারে একই স্থানে নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি কেনাবেচার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। গত পাঁচ সপ্তাহের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ সপ্তাহেও গাড়িপ্রেমীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। গতকাল দিনভর বৃষ্টি থাকলেও আইসিসিবির এক্সপো ভিলেজের ভেতরে ছিল ব্যস্ততা। কেউ পছন্দের গাড়ি দেখছিলেন, কেউ বিক্রেতার সঙ্গে দরদাম করছিলেন। আবার কেউ গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংকঋণের সুবিধা সম্পর্কে জানতে ব্যস্ত ছিলেন। প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্রেতারা তাঁদের গাড়ি নিয়ে আসেন। ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতেও ছিল উল্লেখযোগ্য সাড়া। সুপার সেল কার বাজারে শুধু গাড়ি নয়, মোটরসাইকেল কেনাবেচারও সুযোগ রয়েছে। ক্রেতারা যেমন পছন্দের বাহন বেছে নিতে পারছেন, তেমনি বিক্রেতারাও দালালের মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেদের ব্যবহৃত গাড়ি বা মোটরসাইকেল বিক্রি করতে পারছেন। আয়োজকদের ভাষ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে বিভিন্ন শোরুম ঘুরে গাড়ি দেখতে ক্রেতাদের যে সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, সুপার সেল কার বাজারে সেই ঝামেলা অনেকটাই কমে এসেছে। এখানে একই ছাদের নিচে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি দেখার সুযোগ মিলছে। ফলে প্রায় ৫০টি শোরুম ঘুরে গাড়ি দেখার অভিজ্ঞতা এক জায়গায় বসেই পাচ্ছেন ক্রেতারা। আয়োজকরা আরও জানান, এক্সপো ভিলেজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বৃষ্টি কিংবা রোদের কারণে গাড়ি দেখা ও কেনাবেচায় কোনো বিঘ্ন ঘটছে না। ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দালালমুক্তভাবে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। আইসিসিবির ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের “সুপার সেল কার বাজার”-এর ষষ্ঠ পর্ব চলছে, যা বিগত প্রায় দেড় মাস ধরে পরিচালিত হচ্ছে। সকাল থেকে দিনভর মুষলধারে বৃষ্টি হলেও আইসিসিবির এক্সপো ভিলেজে এক ছাদের নিচে চমৎকার পরিবেশ থাকায় বাইরের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কোনো নেতিবাচক প্রভাব কার বাজারে পড়েনি। প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক ক্রেতা, দর্শনার্থী ও বিক্রেতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিয়েছেন।’ তিনি আরও জানান, ঢাকায় সন্ধ্যার দিকে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ায় আয়োজনের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতি শুক্রবার বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চলছে সুপার সেল কার বাজার।

আবাসন খাতের মন্দায় বিপাকে নির্মাণসামগ্রীর বাজার
একটি দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি শুধু বড় শিল্পকারখানা কিংবা রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে আবাসনসহ বিভিন্ন সহযোগী শিল্পের কার্যক্রম। আবাসন খাতে বিনিয়োগ, নির্মাণকাজ ও ফ্ল্যাট বিক্রির গতি কমে গেলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, রং, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ অসংখ্য শিল্পে। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা। এ কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আবাসন খাতকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা। বাসস্থান মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে একটি স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন প্রায় সবাই। মানুষের এই চাহিদা পূরণে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে এ খাতের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শুধু আবাসন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতকে কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে এ খাতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলা এবং এর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি আবাসন খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বজায় রাখা, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ক্ষেত্রে আবাসন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবাসন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে আড়াই শতাধিক সহযোগী ও উপশিল্প। ফলে এ খাতে নির্মাণকাজের গতি কমে গেলে একসঙ্গে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালি এবং সিরামিক ও টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ভবনের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজে ব্যবহৃত রং, কাচ ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পও আবাসন খাতের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম, পাইপ এবং স্যানিটারি ফিটিংস উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার সঙ্গেও এ খাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আবাসন বাজারে মন্দা দেখা দিলে কিংবা ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে নির্মাণকাজের চাহিদা হ্রাস পায়। এর প্রভাব দ্রুত পড়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিক্রিতে। একপর্যায়ে কারখানায় উৎপাদন কমানো, ব্যবসা সংকুচিত করা এবং নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে সামগ্রিক শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নির্মাণ ও আবাসন খাত দেশের অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানমুখী খাত। এ খাতের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রকৌশলী, স্থপতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপক, নির্মাণকাজের তদারককারী থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ শ্রমিক। শুধু নির্মাণকাজেই নয়, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন ও সরবরাহের মতো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেও বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে আবাসন খাতের কার্যক্রম ব্যাহত হলে এর প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেখা দিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা। এর প্রভাব পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, বাজারে পণ্যের চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে। তাই কর্মসংস্থান রক্ষা ও অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আবাসন খাতের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যবসাবান্ধব নীতি: বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে স্থিতিশীল, সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো গেলে উদ্যোক্তারা পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাবেন। সহজ শর্তে গৃহঋণ: ক্রেতা ও আবাসন নির্মাতা—উভয় পক্ষের জন্য সহজ শর্তে এবং তুলনামূলক কম সুদে ঋণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়নেও সহায়তা মিলতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার: আবাসন খাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থিতিশীল রাখা: রড, সিমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন। এসব উপকরণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নির্মাণ ব্যয় বাড়ে, যা আবাসনের মূল্য ও ক্রেতাদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন, আবাসন শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাস্তবসম্মত নীতিসহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্য স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ এ খাতের কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে। তাঁদের প্রত্যাশা, আবাসন খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা এর উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। কারণ, একটি গতিশীল আবাসন খাত শুধু মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শিল্পের উৎপাদন, বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতি। তাই আবাসন খাতকে সুরক্ষিত রাখা মানে এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শিল্পের বিকাশের পথও সুগম করা।

কোরআনে ব্যবসা: বৈধ উপার্জন থেকে ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন
পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য হেদায়েতের প্রধান উৎস। এতে মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় নানা দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাই কোরআনের শিক্ষা শুধু ইবাদত-বন্দেগি কিংবা পরকালীন জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কেও এতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের বৈধ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তবে এই উপার্জন হতে হবে ন্যায়, সততা, পারস্পরিক সম্মতি ও আল্লাহর বিধান মেনে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড যেন মানুষের অধিকার নষ্ট না করে এবং দ্বিন পালনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—সেদিকেও কোরআন বিশেষভাবে সতর্ক করেছে। কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারণা পবিত্র কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্য বোঝাতে প্রধানত ‘তিজারা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া ‘বাই’ অর্থ বেচাকেনা বা লেনদেন এবং ‘শিরা’ অর্থ ক্রয় করা—এই শব্দগুলোর মাধ্যমেও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ করা হয়েছে। কোরআনে ‘তিজারা’ শব্দটি চারটি সুরার ছয়টি স্থানে মোট আটটি আয়াতে এসেছে। এর মধ্যে সুরা বাকারায় রয়েছে পাঁচটি আয়াত। অন্যদিকে ‘বাই’ ও ‘শিরা’ শব্দ দুটি সাতটি সুরায় চারটি স্থানে মোট ১৯ আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে সুরা বাকারায় এ শব্দগুলোর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ১. ব্যবসা-বাণিজ্য বৈধ উপার্জনের মাধ্যম ইসলাম বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যকে অনুমোদন করেছে। একই সঙ্গে সুদকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘যারা সুদ খায় তারা সেই ব্যক্তিরই মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় তো সুদের মতো। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।’ —সুরা বাকারাহ, আয়াত ২৭৫ অর্থাৎ ইসলামে ব্যবসা বৈধ; কিন্তু সেই ব্যবসা হতে হবে শরিয়তসম্মত ও ন্যায়সংগত। ২. লেনদেনে থাকতে হবে উভয় পক্ষের সম্মতি কোনো ব্যক্তির সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা ইসলামে বৈধ নয়। ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি থাকা জরুরি। আল্লাহ বলেন— ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; কিন্তু তোমাদের পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করা বৈধ।’ —সুরা নিসা, আয়াত ২৯ অতএব প্রতারণা, ভয় দেখানো, চাপ প্রয়োগ কিংবা অন্যায় প্রভাব বিস্তার করে কোনো লেনদেন করা ইসলামের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ৩. ঋণ ও আর্থিক লেনদেন লিখিত রাখা উত্তম ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ বিরোধ এড়ানোর জন্য লেনদেনের বিষয়টি লিখিত রাখার ওপর কোরআন গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ বা পাওনা থাকলে তা লিখে রাখার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো, তখন তা লিখিয়ে রেখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ —সুরা বাকারাহ, আয়াত ২৮২ এ নির্দেশ ব্যবসায়িক লেনদেনে দলিল, হিসাব ও স্বচ্ছতার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে। ৪. অধিক মুনাফার আশায় প্রতারণা করা যাবে না ব্যবসায় লাভ করা বৈধ হলেও অতিরিক্ত লাভের লোভে মানুষকে ঠকানো, ওজনে কম দেওয়া কিংবা পণ্যের ক্ষেত্রে অসততা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দিত। আল্লাহ বলেন— ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যারা লোকের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ —সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত ১-৪ সুতরাং একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে লাভের চেয়ে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার গুরুত্ব বেশি। ৫. জীবিকার সন্ধানে দেশ-বিদেশে সফর করা বৈধ জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ ও ব্যবসা করাকে কোরআন নেতিবাচকভাবে দেখেনি। বরং আল্লাহর অনুগ্রহ বা জীবিকা অনুসন্ধানের জন্য সফরের কথা কোরআনে এসেছে। আল্লাহ বলেন— ‘আল্লাহ জানেন যে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধানে দেশভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।’ —সুরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত ২০ আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দ্বিনি জ্ঞান অর্জনের সফর সর্বোত্তম; এরপর ঈমান রক্ষার জন্য হিজরত এবং জীবিকার সন্ধানে করা সফরও গুরুত্বপূর্ণ। ৬. নৌ-বাণিজ্যের গুরুত্বও কোরআনে এসেছে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও জীবিকা অনুসন্ধানের বিষয়টিও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন— ‘তোমরা দেখো তার (সমুদ্রের) বুক চিরে নৌযান চলাচল করে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ —সুরা ফাতির, আয়াত ১২ এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমুদ্র ও নৌপথেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ৭. ব্যবসায় সময় ও মৌসুমের গুরুত্ব রয়েছে ব্যবসায় সঠিক সময় ও বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্য সফরের প্রসঙ্গ এসেছে— ‘যেহেতু কুরাইশের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের।’ —সুরা কুরাইশ, আয়াত ১-২ তাফসিরবিদদের মতে, কুরাইশরা শীতকালে ইয়েমেন এবং গ্রীষ্মকালে শাম অঞ্চলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাতায়াত করত। অর্থাৎ বাণিজ্যে সময়, স্থান ও মৌসুমের উপযোগিতা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিনদারি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে ভারসাম্য ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি একজন মুমিনের জীবনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দ্বিনদারির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে। ব্যবসা যেন ঈমান, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে না দেয়—এ বিষয়ে কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ১. ঈমান ও নেক আমলও এক ধরনের সফল ‘ব্যবসা’ কোরআনে ঈমান ও আল্লাহর পথে আত্মত্যাগকে ব্যবসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন— ‘হে মুমিনরা! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে; তা এই যে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করবে।’ —সুরা সাফ, আয়াত ১০-১১ অর্থাৎ প্রকৃত মুমিনের সবচেয়ে বড় লাভ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ২. বৈধ ব্যবসা ও ইবাদত পাশাপাশি চলতে পারে ব্যবসা যদি ইসলামের বিধান পালনে বাধা সৃষ্টি না করে, তাহলে ব্যবসার পাশাপাশি ইবাদত ও দ্বিনি দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ বৈধ। আল্লাহ বলেন— ‘তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করাতে তোমাদের কোনো পাপ নেই।’ —সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৯৮ ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর তাফসিরে ‘আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান’-এর মধ্যে ব্যবসার অর্থও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ হজের মতো ইবাদতের সময়ও বৈধ ব্যবসা করার সুযোগ ইসলামে রয়েছে। ৩. ব্যবসা যেন ইবাদতের পথে বাধা না হয় ব্যবসা করা বৈধ হলেও ব্যবসার কারণে নামাজ, আল্লাহর স্মরণ কিংবা অন্যান্য দ্বিনি দায়িত্ব পরিত্যাগ করা গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআনে এমন ব্যক্তিদের সতর্ক করা হয়েছে, যারা ব্যবসা ও বিনোদনের কারণে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়। আল্লাহ বলেন— ‘যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বোলো, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উত্তম।’ —সুরা জুমা, আয়াত ১১ ৪. দ্বিনের দায়িত্বকে ব্যবসার ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে ব্যবসা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, আল্লাহর ফরজ নির্দেশের সঙ্গে যখন ব্যবসার সংঘাত তৈরি হবে, তখন দ্বিনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জুমার নামাজের আহ্বানের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন— ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কোরো, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি করো।’ —সুরা জুমা, আয়াত ৯ ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা শুধু অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যম নয়; এটি সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের অধিকার রক্ষারও একটি ক্ষেত্র। বৈধ পথে উপার্জিত সম্পদ যেমন মানুষের পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি আল্লাহর বিধান মেনে পরিচালিত ব্যবসা মুমিনের জন্য সওয়াবের কারণও হতে পারে। তাই একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর লক্ষ্য হওয়া উচিত—হালাল উপার্জন, সৎ লেনদেন, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ব্যবসার পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন। কোরআনের এই শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও অর্থনীতিতে ন্যায়ভিত্তিক একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।

প্রণোদনা ঋণে ব্যাংকের অসহযোগিতার অভিযোগ ব্যবসায়ীদের
বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনতে ঘোষিত প্রণোদনা ঋণ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। ঋণ প্রাপ্তির শর্ত সহজ করার পাশাপাশি খেলাপিমুক্ত হওয়ার জন্য ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দেওয়ার বিধান প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে ঋণের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ব্যাংকগুলোর দীর্ঘসূত্রতা কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ নিতে গিয়ে ব্যাংক পর্যায়ে নানা ধরনের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে, আবার ঋণের আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও দীর্ঘ সময় লাগছে। বৈঠকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), বাংলাদেশ চেম্বার অব অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএ), বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএ) এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদ ও মো. সরোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নীতিমালায় কোনো ঘাটতি, অস্পষ্টতা বা বাস্তবায়নগত সমস্যা রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা জানান, ঋণ বা আর্থিক সহায়তার আবেদন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকে পর্ষদ সভা হতে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে তাঁরা প্রতি সপ্তাহে অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ পরিচালনা পর্ষদ সভা আয়োজন করে প্রণোদনা ঋণের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান। এ ছাড়া ঋণের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া বন্ধ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করারও দাবি জানানো হয়। ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ে জটিলতার কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা প্রণোদনা কর্মসূচির সুবিধা নিতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রণোদনা কর্মসূচির নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌথ দায়িত্ব। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রুত সহায়তা পান, সে জন্য ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সাংবাদিকদের বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে সুবিধা নিতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যাংকের অসহযোগিতার কারণে অনেকেই আবেদন করতে পারছেন না। কোনো কোনো ব্যাংক আবেদন গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে, আবার কিছু ব্যাংক নানা অজুহাতে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা পরিপত্রে কিছু জটিলতা রয়েছে। এসব জটিলতা দ্রুত দূর করে ইতোমধ্যে জমা পড়া আবেদনগুলো নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে গত মে মাসে ৬২ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার কথা। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঘোষণার চার মাস পার হলেও প্রণোদনা কর্মসূচির বাস্তব সুফল অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়নি বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। অন্য খাতগুলোর ক্ষেত্রেও ঋণ বিতরণের গতি সন্তোষজনক নয়।

৭০ বছর পর ফের সচল আসাম-ঢাকা নৌপথ, প্রথম পণ্যবাহী চালান পৌঁছাচ্ছে পানগাঁওয়ে
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই প্রথমবারের মতো ভারতের আসাম থেকে সরাসরি জলপথে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী বাণিজ্যিক চালান পাঠানো হয়েছে। সোমবার আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। শহরটির ঐতিহ্যবাহী নৌঘাট বন্ধ হওয়ার প্রায় সাত দশক পর এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হলো। ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও নৌপথবিষয়ক মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বগিবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের এই পণ্যবাহী বার্জটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা উদ্বোধন করেন। বার্জটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ‘কুশল কুনওয়ার’ নামের একটি শক্তিশালী টাগবোট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। আসামের নামরূপে অবস্থিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড’-এর উৎপাদিত মিথানল বহনকারী বার্জটি ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ বা ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে প্রথমে পৌঁছাবে বাংলাদেশ সীমান্তে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট ব্যবহার করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদী হয়ে বুড়িগঙ্গা তীরের পানগাঁও নৌবন্দরে গিয়ে নোঙর করবে চালানটি। ডিব্রুগড় থেকে পানগাঁও পর্যন্ত এই যাত্রায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিতে হবে বার্জটিকে। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এই উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বহুমুখী যোগাযোগ বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই এই বাণিজ্য সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, উনিশ শতকে পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সাল থেকেই কলকাতা ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে নিয়মিত স্টিমারযোগে চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহন হতো। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৫০ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ফলে নদীর তলদেশে ব্যাপক পরিবর্তনের পর এই বাণিজ্য ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৫৪ সালে পণ্য বুকিং বন্ধ হওয়ার পর ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ডিব্রুগড় নৌঘাট। দীর্ঘ সাত দশক পর পুনরায় পণ্য পরিবহনের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক নৌপথটি আবারও সচল হলো।

আকাশসীমায় আধুনিক নজরদারি, বাড়ল ওভারফ্লাই রাজস্ব
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে আধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) প্রযুক্তি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নবনির্মিত অত্যাধুনিক এটিসি টাওয়ার ও পূর্ণাঙ্গ রাডার ব্যবস্থা চালুর পর দেশের আকাশপথে নজরদারি ও ব্যবস্থাপনায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি উড়োজাহাজের চলাচল আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক এই প্রযুক্তি চালুর পর আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে আদায় করা ওভারফ্লাই বা ফ্লাইওভার চার্জ থেকেও রাজস্ব আয় বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুধু ওভারফ্লাই ফি থেকেই সরকারের আয় হয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসে রাজস্ব এসেছে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) ও বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ওভারফ্লাই ফি বাবদ আয় হয়েছিল ৩৩৮ কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী ছয় মাসে আয় আরও বেড়ে প্রায় ৪১৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর মাসে গড়ে ৭০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় সীমিত সক্ষমতার রাডার ও অ্যানালগ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমার বিস্তীর্ণ অংশ, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন এলাকায় উড়োজাহাজ চলাচলের ওপর কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নজরদারি করা কঠিন ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ অবস্থায় দেশের আকাশসীমায় চলাচলকারী বিদেশি উড়োজাহাজের গতিপথ ও অবস্থান নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী ফি আদায়ের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতির কারণে আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় পরোক্ষ নির্ভরশীলতাও তৈরি হয়েছিল। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে আধুনিক এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) এবং কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স (সিএনএস) ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এটিসি টাওয়ার ও রাডার ব্যবস্থা উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটি ফ্রান্সের এভিয়েশন ও ডিফেন্স প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘থেলস’-এর সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সিএএবির নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলা এই অবকাঠামোর মাধ্যমে দেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক রাডার ও সার্ভেইল্যান্স প্রযুক্তির কারণে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজগুলোর অবস্থান, গতিপথ ও চলাচল সম্পর্কে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে নির্ধারিত ফি আদায়ের প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের সীমিত রাডার সক্ষমতার কারণে দেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় যে ঘাটতি ছিল, নতুন প্রযুক্তি তা অনেকাংশে দূর করেছে। একই সঙ্গে আকাশপথে নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে সক্ষমতা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুটের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের আকাশসীমা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বিদেশি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক রাডার ও এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব উড়োজাহাজের চলাচল সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা গেলে আকাশসীমা ব্যবহারের ফি থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে দেশের এভিয়েশন খাতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আকাশসীমা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর ও স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল আকাশপথ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ওভারফ্লাই ফি থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, চার মাসেও বিতরণে ধীরগতি
বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা স্কিমে চার মাস পরও প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে তহবিল সংগ্রহে চুক্তি হলেও ঋণ বিতরণে ধীরগতি রয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসএমই ও কৃষি খাতে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যেও ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে যাতে এই সুবিধা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হলে পুরো উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। গত মে মাসে বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। এ লক্ষ্যে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে অর্থায়নের জন্য ১৭টি এবং কৃষি ঋণের জন্য ৪৩টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন খাতে সোনালী ব্যাংক সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার তহবিল গঠনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ১৫টি খাতে প্রক্রিয়াধীন ও বিতরণ করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক আবেদন চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেগুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখেছে এবং বিতরণও শুরু হয়েছে।’ সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে তারা অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ আবেদন পেয়েছে। আর অগ্রণী ব্যাংক জানিয়েছে, সিএমএসএমই ও কৃষি খাতে প্রায় ৩০০ জনকে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বড় অঙ্কের ঋণের আবেদন এলে প্রস্তাবকারীর ঋণ পরিস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে। অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারসোমা আলম বলেন, ‘ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটা ভালো একটা সুযোগ। তারা এখন এগিয়ে আসছে, তারা শাখায় যোগাযোগ করছে এবং প্রস্তাব আসছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করে যত দ্রুত সম্ভব আমরা দেয়ার চেষ্টা করছি।’ সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘যারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের বেশিরভাগই কিন্তু এখনও কিন্তু তাদের ঋণগুলো অনিয়মিত আছে। সেগুলা আগে নিয়মিতকরণ করতে হবে, এরপরে কিন্তু প্রণোদনার আওতায় ঋণ দেয়া যাবে।’ ঘোষিত প্রণোদনা স্কিমে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি খাতেও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংকের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের নীতি সহায়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও গ্রাহকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন তারা। টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক অধ্যাপক মেহেদী রহমান বলেন, ‘নীতিগত কিছু সমস্যা আছে। ত্রিমুখী সমস্যা আছে। এই যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, কর্মাশিয়াল ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে মিটিং হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি ছাড় দিতে পারে আর কর্মাশিয়াল ব্যাংক কি করতে পারে এবং আমরা কি করতে পারি এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা না হলে কাজটা ভালোভাবে আগাবে না।’ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে কম সুদে নগদ প্রবাহ বাড়াতে এই প্রণোদনা সহায়ক হতে পারে। তাদের মতে, অন্তত ৫০০টি কারখানা পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সুবিধাটি যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই পান, সেটি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘যাদের কারখানায় কাজ চলছে, কিংবা টাকার জন্য কাজ বন্ধ আছে তাদের জন্য এটা খুব ভালো হবে।’ বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘কারখানার নামে টাকা নিয়ে সে টাকা যেন পাঁচার না হয় সে বিষয়ে নজরদারি রাখা উচিত।’ অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ বা প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা না গেলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। এতে পুরো উদ্যোগের লক্ষ্যই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ নেয়ার পর তা যদি কর্মসংস্থান তৈরির পেছনে কাজে না লাগানো যায়, তাহলে তো আর সে ঋণ দিয়ে কোনো লাভ হলো না।’ সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দুর্বল যাচাই-বাছাই এবং ব্যাংকগুলোর কার্যকর তদারকির অভাবে নতুন করে বিতরণ করা ঋণও ভবিষ্যতে খেলাপিতে পরিণত হতে পারে। ফলে প্রণোদনার অর্থ সঠিক খাতে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। সুত্র- আমার সংবাদ ।

প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে উদ্যোক্তা বাছাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসা পরিচালনায় উদ্যোক্তাদের যে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, তা কমাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজের আওতায় স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদহার প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করা উদ্যোক্তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ কমাতে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজশাহী নগরের ভেড়িপাড়া মোড় এলাকার প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বেসরকারি খাতে গতি সঞ্চার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ব্যবসায়ী, চেম্বার নেতারা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার। অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তরুণদের মধ্যে যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগাতে ‘উদ্যোগ’ নামে একটি বিশেষ স্কিম চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে উদ্যোক্তা নির্বাচন করে মোট ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে স্কিমটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী নভেম্বর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হবে। কৃষকদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার বিষয়ে মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের সুবিধা যাতে আরও বেশি প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায়, সে জন্য প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তি জামানত রাখার পরিবর্তে বিকল্প জামানত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের অর্থায়নপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে কার্যকর করা জরুরি। এ লক্ষ্যে ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

গাড়িপ্রেমীদের আগ্রহে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে সুপার সেল কার বাজার
ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া এবং গাড়ির বাজারে বাড়তি আগ্রহের কারণে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘সুপার সেল কার বাজার’-এর সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে প্রতি শুক্রবারের এ আয়োজন চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রতি শুক্রবার আইসিসিবিতে বসছে গাড়ি কেনাবেচার এ বিশেষ বাজার। টানা চার সপ্তাহের সাড়া পাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার পঞ্চম সপ্তাহেও বসে ‘সুপার সেল কার বাজার’। এবার মেলায় নতুন সংযোজন হিসেবে যুক্ত হয়েছে এশিয়ান ইমপোর্ট’সের আমদানি করা নতুন গাড়ি। নতুন গাড়ির পাশাপাশি রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি নিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে দেখা গেছে। উইজার্ড শোবিজ ও আইসিসিবির যৌথ উদ্যোগে শুরু হওয়া এ কার বাজার এতদিন প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলত। আয়োজকরা জানান, একই স্থানে নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি দেখা এবং কেনাবেচার সুযোগ থাকায় আয়োজনটি ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাঁদের বাড়তি সাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারের সময় আরও এক ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করা হয়েছে। ‘সুপার সেল কার বাজারে’ প্রবেশ করতেই দেখা যায় বিভিন্ন মডেল ও ব্র্যান্ডের সারি সারি গাড়ি। একদিকে রয়েছে নতুন গাড়ি, অন্যদিকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। আরেক অংশে রাখা হয়েছে ব্যবহৃত গাড়ি। এসব ব্যবহৃত গাড়ির অনেকগুলোই আগে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। পুরনো গাড়ি বিক্রি করে নতুন গাড়ি কেনার পরিকল্পনা থেকেই মালিকরা এসব গাড়ি বাজারে এনেছেন। মাত্র ১২৭টি গাড়ি নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বাজারে পঞ্চম সপ্তাহে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬০টিতে। ফলে একই জায়গায় বিভিন্ন ধরনের গাড়ি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন ক্রেতারা। গতকাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, কেউ নতুন গাড়ির খোঁজ করছেন, আবার কেউ ব্যবহৃত গাড়ি কেনার আগে এর বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করছেন। পছন্দের গাড়ি চূড়ান্ত করার আগে অনেক ক্রেতাকেই একাধিক গাড়ির মডেল, দাম, বৈশিষ্ট্য ও সুযোগ-সুবিধা তুলনা করতে দেখা যায়। এবারের আয়োজনে সাড়ে ছয় লাখ টাকা থেকে শুরু করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত দামের গাড়ি রয়েছে। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন অফারও দিচ্ছেন বিক্রেতারা। এশিয়ান ইমপোর্ট’সের কর্মকর্তারা জানান, ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে এবার মেলায় নতুন ইভি কার যুক্ত করা হয়েছে। জাপানি ও চায়নিজ—দুই ধরনের ইভি কারের পাশাপাশি রিকন্ডিশন্ড গাড়িও পাওয়া যাচ্ছে। আইসিসিবির ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, গত চার সপ্তাহের সফল আয়োজনের পর এবার পঞ্চম সপ্তাহে চলছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। এরই মধ্যে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। গতকাল ৩৫০টিরও বেশি গাড়ি মেলায় এসেছে। আগের চার সপ্তাহের তুলনায় এবার ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি ও আগ্রহ বেশি হওয়ায় মেলার সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করা হয়েছে। এক ছাদের নিচে নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি দেখার পাশাপাশি সরাসরি কেনাবেচার সুযোগ থাকায় ‘সুপার সেল কার বাজার’ ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য গাড়ি কেনাবেচার একটি বড় আয়োজন হিসেবে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

বসুন্ধরাবাসীর কল্যাণে নতুন অফিস, যুক্ত হচ্ছে আরও সেবা
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সেবা কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নতুন কার্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যালয়টির উদ্বোধন করা হয়। নতুন এ কার্যালয়ের মাধ্যমে সোসাইটির সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সুসংগঠিত হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজন ও অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতেই সোসাইটি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে অ্যাম্বুল্যান্স সেবা চালু করা হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচে বাসিন্দারা এ সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। তিনি বলেন, অনেক সময় জরুরি প্রয়োজনে বাসিন্দাদের ওষুধ সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাসায় বাসায় জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ওষুধ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে। আগামী সপ্তাহ থেকে এ সেবা কার্যকর হবে বলেও জানান তিনি। সোসাইটির মহাসচিব ক্যাপ্টেন (অব.) শেখ এহসান রেজা বলেন, বসুন্ধরার বাসিন্দাদের কল্যাণ এবং তাদের জন্য সেবার মান উন্নত করাই বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নতুন কার্যালয়ের মাধ্যমে সোসাইটির কর্মকাণ্ড আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নতুন অফিস থেকে বাসিন্দাদের বিভিন্ন অভিযোগ ও সেবাসংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কল্যাণমুখী আবাসিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সোসাইটি কাজ করে যাবে। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি। শেখ এহসান রেজা জানান, বাসিন্দাদের জন্য অ্যাম্বুল্যান্স সেবার পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি ওষুধ ডেলিভারি এবং ইউটিলিটি সেবার আওতায় প্লাম্বিং ও ইলেকট্রিশিয়ান সেবা চালু করা হয়েছে। এসব সেবা সহজে পাওয়ার জন্য একটি কল সেন্টারও চালু করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে সোসাইটির সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে বাসিন্দারা ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। অনুষ্ঠানে সোসাইটির নির্বাহী সহসভাপতি কাজী দিদার আহম্মেদ, অর্থ সম্পাদক ইমরুল হাসানসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সোসাইটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের সেবাদান কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত ও গতিশীল করা হবে। একই সঙ্গে বাসিন্দাদের বিভিন্ন অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সমস্যার কার্যকর সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স
সেপ্টেম্বর মাসে দেশে মোট ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য থেকে এ হিসাব জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৮৫৯ কোটি ১০ লাখ ডলার প্রবাস আয় এসেছে। অন্যদিকে, গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৭৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তিন মাসের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে মোট ৮ দশমিক ৫৯১ বিলিয়ন ডলার প্রবাস আয় এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৮৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর একদিনেই দেশে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বেড়েছে তেলের দাম। অঞ্চলটিতে সংঘাতের রেশ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি, যার প্রভাব স্পষ্টভাবে পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়েছে ৬৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, ফলে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৫ দশমিক ৯১ ডলারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও একই সময়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই তেলের দাম ৭২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ব্যারেলপ্রতি ৯৩ দশমিক ৩২ ডলারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের জেরে তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো বাজারে প্রভাব ফেলে চলেছে। যদিও অঞ্চলটি থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ধীরে ধীরে বাড়ার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তবু সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তাই এখন তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে চাপ আরও বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে আরও ওঠানামার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

আইসিসিবিতে পাকিস্তানি পণ্যের প্রদর্শনী, সঙ্গে চামড়া ও গাড়ির বাজার
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) একসঙ্গে চলছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, চামড়াজাত পণ্য ও গাড়ি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে একাধিক আয়োজন। ‘চতুর্থ মেড ইন পাকিস্তান’ প্রদর্শনী, দশম আন্তর্জাতিক চামড়া ও জুতা প্রদর্শনী এবং সাপ্তাহিক ‘সুপার সেল কার বাজার’ ঘিরে দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ছুটির দিনে এসব আয়োজনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। আইসিসিবির গুলনকশা হলে পাঁচ দিনব্যাপী ‘চতুর্থ মেড ইন পাকিস্তান’ প্রদর্শনীর আজ শেষ দিন। এতে পাকিস্তানের বিভিন্ন খাতের ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। তৈরি পোশাক, কসমেটিকস, ক্রীড়াসামগ্রী, গয়না, খাদ্য ও পানীয়, চামড়াজাত পণ্য এবং সুগন্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদারি তৈরিই এ প্রদর্শনীর অন্যতম লক্ষ্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগের ফলে আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাকিস্তানের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। অন্যদিকে, আইসিসিবির নবরাত্রি হলে চলছে তিন দিনব্যাপী দশম আন্তর্জাতিক চামড়া ও জুতা প্রদর্শনী। আজ এ প্রদর্শনীরও শেষ দিন। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশের ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, ক্রীড়া পোশাক, জুতা তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতি, উৎপাদন উপকরণ, রাসায়নিক দ্রব্য, খুচরা যন্ত্রাংশসহ নানা ধরনের পণ্য ও প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন, লেদার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলজিস্টস সোসাইটি ও লিমরা এক্সিবিশন যৌথভাবে এ আয়োজন করেছে। ছুটির দিনে এ প্রদর্শনীতেও ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। দেশীয় প্রতিষ্ঠান ডির লেদার চামড়ার ব্যাগ, বেল্ট, জুতা, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে অংশ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও ফরিদা ইয়াসমিন বিথি বলেন, ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের ভালো সাড়া পাওয়া গেছে এবং শেষ দিনে আরও বেশি সাড়া পাওয়ার আশা রয়েছে। এদিকে আইসিসিবিতে প্রতি শুক্রবার বসছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। উইজার্ড শোবিজ ও আইসিসিবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বাজার গতকাল চতুর্থ সপ্তাহে পা দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে এ আয়োজনের পরিসর ও ক্রেতা-দর্শনার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে। নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি একই জায়গায় দেখার পাশাপাশি সরাসরি দরদাম করে কেনাবেচার সুযোগ থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। প্রায় ১ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে আয়োজিত এ কার বাজারে এবার ৩০০টিরও বেশি গাড়ি রয়েছে। প্রথম সপ্তাহে গাড়ির সংখ্যা ছিল প্রায় ১২৭টি। অর্থাৎ চার সপ্তাহের ব্যবধানে গাড়ির উপস্থিতি তিন গুণের বেশি বেড়েছে। আয়োজকদের দাবি, এক জায়গায় বিভিন্ন ধরনের গাড়ি পাওয়ায় ক্রেতারা একসঙ্গে প্রায় ৫০টি শোরুম ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন। কার বাজারের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে আধুনিক আরভি ভেহিকল। গাড়িটিতে ভ্রমণের সময় অস্থায়ীভাবে অবস্থান, ঘুমানো ও রান্নাবান্নার মতো সুবিধা রয়েছে। পরিবার নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিনোদনমূলক গাড়ির প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহও দেখা গেছে। পাশাপাশি গাড়িগুলোর জন্য ‘হুন্দাই’-এর সার্বক্ষণিক কার চেকআপ সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আইসিসিবির ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার মেহেদী হাসান মোল্লা জানান, সকাল থেকেই দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গাড়ি বিক্রি হয়েছে এবং আরও অনেক গাড়ি বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। সব মিলিয়ে আইসিসিবিতে চলমান এসব আয়োজন রাজধানীর ক্রেতা, দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীদের জন্য একই সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, পণ্য প্রদর্শন ও কেনাবেচার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে তিন আয়োজনকে ঘিরে মানুষের উপস্থিতি আইসিসিবিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

সরকারি ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল, উৎপাদন হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বৈরী পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে বাড়তি চাপের মুখে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যবহার সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন সারা দেশের ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারি অবকাঠামোর অব্যবহৃত ছাদকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এ উদ্যোগকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় কর্মপরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচিটির বিস্তারিত তুলে ধরেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩৭০ কোটি টাকা সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করার পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় শুধু রাজধানী বা বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ের সরকারি স্থাপনাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ভবন; স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (LGED) মাঠপর্যায়ের কার্যালয়; বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়াসা (WASA) কার্যালয়; জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন ভবন; দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্র, হাট-বাজার ও গ্রোথ সেন্টার। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত ছাদে আধুনিক সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় গ্রিডেও যুক্ত করা যাবে। তিনি আরও জানান, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সংবলিত চিঠিও পাঠানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরের ২৭ জানুয়ারির মধ্যে পুরো কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশের ৬ হাজার ৫৪৪টি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ভবনের ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হলে একদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরূপ প্রভাবও কমানো সম্ভব হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক সরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদকে একটি সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে সরকারি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার একটি কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকে ২০১৭-২৪ নিয়োগ: ৮৫৪২ জনের ক্ষেত্রে মানা হয়নি নিয়ম
সুনির্দিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই ঘটনা ঘটে। নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে বড় অংশই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এই প্রক্রিয়ায়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশই চট্টগ্রামের, বিশেষ করে সাইফুল আলম ওরফে এস আলমের জন্মস্থান পটিয়ার বাসিন্দা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে ইসলামী ব্যাংকের ওই সময়কার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকে মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৫৫১। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ১০ হাজার ৮৩২ জনকে। ওই সময় ব্যাংকটি এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৪৬৬ জন ছিলেন লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে এবং ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ পান। ইসলামী ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার বিধান ছিল। প্রার্থীদের আবেদন করার জন্য অন্তত ১৫ দিন সময় দেওয়ার পাশাপাশি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হতো। উভয় পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়া নিয়োগের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু ২০১৭ সালে ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের পর এই প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটে। ওই সময় ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে নিয়মসিদ্ধ করার জন্য ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় নতুন করে বলা হয়, ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনবলের প্রয়োজন অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেল ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগ দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল নিয়োগবিধির ৭.০১ ধারা কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। ওই ধারায় বিভিন্ন গ্রেডে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন করার জন্য কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে সাধারণত সীমিতসংখ্যক লেটারাল এন্ট্রি বা বিশেষায়িত কারিগরি পদে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে সেই বিধান ব্যবহার করে প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা অস্বাভাবিক। আরও বলা হয়েছে, ওই সময় ব্যাংকে বড় ধরনের জনবল সংকট ছিল—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। বরং বিজ্ঞপ্তি ছাড়া যে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, তা ব্যাংকের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল বলে সে সময়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনই পটিয়ার বাসিন্দা। পটিয়া এস আলমের জন্মস্থান হওয়ায় এই নিয়োগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীদের আবেদন ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগ পাওয়ায় ব্যাংকে একটি কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে দেশের অন্যান্য এলাকার যোগ্য প্রার্থীরা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি ও লিখিত পরীক্ষা ছাড়া কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল বলে পরিদর্শনে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের বাক্স রাখা হতো। এসব বাক্সে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘মহিলা-ক্যাশ’, ‘নারী’ ও ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন পরিচয় লেখা থাকত। এসব বাক্সে জমা পড়া সিভি থেকে পছন্দের প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো। এরপর প্রধান কার্যালয় থেকেই তাদের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের ২৬টি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগে নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ব্যাচের নিয়োগে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে তাদের লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগকে। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন। ব্যাংকের নিয়মানুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু ওই নম্বর অর্জন করতে পারেন মাত্র ৩৬ জন। এরপর পাস নম্বর কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এর ফলে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৩০৪ জন। এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা না দিয়েই আরও ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে তালিকার প্রথম ১৭৮ জন এবং লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া ১২ জনসহ মোট ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি ১২৬ জনকে পাঠানো হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। এই প্রার্থীদের সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পাওয়া ১৯০ জনের মধ্যে ১৮৪ জন পরে চাকরিতে যোগ দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরও বেশ কিছু পদে নিয়োগবিধি না মানার তথ্য পাওয়া গেছে। এই সময়ে ২ হাজার ২৩২ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) নিয়োগ দেওয়া হয়, কিন্তু এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৮২৮ জন এবং ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে ৫০১ জনকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। লেটারাল এন্ট্রির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় ৪৬৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ২৬৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী। পরিদর্শনের সময় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঢাকায় কর্মরত ওই সময়ের ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। তাদের সবাই জানান, তারা সিভি জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন কোনো ধরনের মৌখিক পরীক্ষাও দেননি বলে লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তারা সুগন্ধা আবাসিক এলাকা ও পাঁচলাইশে অবস্থিত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে রাখা বাক্সে সিভি জমা দিয়েছিলেন। সেখানেই তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং পরে যোগদানপত্রও দেওয়া হয় বলে তারা জানান। শুধু সাধারণ কর্মী নিয়োগ নয়, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়োগ নীতিমালা অনুসরণ না করার তথ্য পাওয়া গেছে। ইসলামী ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বা ডিএমডি পদে নিয়োগ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আগের পদে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। একই সঙ্গে যোগদানের আগে মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রয়েছে। কিন্তু এস আলম ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দিন মাত্র আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। ডিএমডি হওয়ার আগে আগের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন থাকলেও তার ছিল মাত্র এক বছর চার মাসের অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিনের মোট অভিজ্ঞতা ছিল ১৭ বছর, যেখানে নীতিমালায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল। ডিএমডি হওয়ার আগে দুই বছরের অভিজ্ঞতার বিধান থাকলেও তার ছিল এক বছরের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তনগুলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংযোজন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। একই সঙ্গে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার বাধ্যবাধকতাও অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। তবে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভূমিকা পালন করে। তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অনিয়ম পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে চারটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নিরীক্ষার দায়িত্ব দেয়। সেই নিরীক্ষাতেও এস আলমের সময়কার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই পরীক্ষা বন্ধের দাবিতে দুই কর্মী হাইকোর্টে রিট করেন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, পরীক্ষা আয়োজনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এরপর ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী সবাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং চাকরিতে বহাল থাকেন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মকর্তা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পরীক্ষায় অংশ নেননি। ব্যাংকের অভিযোগ, তাদের কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী কর্মীদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করেন এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। পাশাপাশি কর্মবিরতি, সড়ক বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগও ওঠে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নীতিমালাবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করে। পরিচালনা পর্ষদের পরামর্শ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুসারে ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, ওই কর্মীদের নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—শুধু এই বিবেচনায় তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তিনি বলেন, যে প্রক্রিয়ায় তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন, সেখানে সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া পূর্ণ করার সুযোগ হিসেবে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদেরও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন। ফলে ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করায় তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তের আওতায় দেখেছে বলে জানান তিনি

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানি: দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ
বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানির দরপত্রকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, জালিয়াতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিগত সরকারের সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপকভাবে আলোচিত ‘এস আলম গ্রুপ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছায়া কোম্পানিগুলোকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘লিয়ানেক্স’ এবং তাদের ব্যবসায়িক সহযোগী ‘মোহিত মিনারেলস’ ও ‘লোশে শিপিং’ ভুয়া ও জাল নথি ব্যবহার করে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সিপিও জাহিদুর রহমানের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত এস আলমের ‘এসএস পাওয়ার’ বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যখন চাপ তৈরি হয়েছে, তখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, আর্থিক ও লজিস্টিক সামর্থ্য এবং কয়লার উৎস যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগ উঠেছে, চলমান দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়নি। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সক্ষমতা, প্রমাণিত সরবরাহ অভিজ্ঞতা কিংবা যাচাইকৃত কয়লা খনির নথি না থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ‘মাইন এমওইউ’ এবং ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন কয়লা খনির নথির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিআইএফপিসিএল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মানসম্পন্ন কয়লা সরবরাহে সক্ষম ইন্দোনেশীয় খনিগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এসব নথি যাচাই করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট খনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা ই-মেইলের মাধ্যমে স্বাধীন যাচাইয়ের পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে দরপত্রে জমা দেওয়া নথিগুলো প্রকৃত না জাল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে ওই খনি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ কয়লা সংগ্রহ ও সরবরাহ করতে সক্ষম কি না—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রে যোগ্য ঘোষণা করার আগে তার জমা দেওয়া নথি এবং সংশ্লিষ্ট খনির উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তার ভাষ্য, শুধু কোনো একটি নথি উপস্থাপন করলেই কয়লার উৎসের সত্যতা নিশ্চিত হয় না। যথাযথ যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দেশের কয়লা সরবরাহব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম বলেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইলে সেটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব অভিজ্ঞতা, সরাসরি খনি-সংযোগ এবং বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত নয় বলেও মত দেন তিনি। চলমান দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নথি, খনি-সংযোগ, সরবরাহ সক্ষমতা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে যদি স্বজনপ্রীতি, অসম আচরণ, তথ্য গোপন কিংবা প্রয়োজনীয় নথি যথাযথভাবে যাচাই না করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে চলমান দরপত্র বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগগুলোর বিষয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিম বলেন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে না। একটি দক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি যখন চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কয়লা আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং প্রতিটি নথি ও সরবরাহ উৎসের স্বাধীন যাচাই নিশ্চিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

আইসিসিবিতে শুরু হচ্ছে এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার (এটিএফ)। বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান এবারের মেলায় অংশ নিচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা এবং পর্যটনশিল্পের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের ১৩তম আসরের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মেলার বিভিন্ন আয়োজন ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানান এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হেলাল। আয়োজকদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত মেলার উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে একই মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার ছাড়াও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। আয়োজকেরা জানান, এবারের মেলায় বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। মেলায় প্রায় ৩০০টি বুথ থাকবে। এসব বুথে হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, এয়ারলাইনস, সরকারি ও বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান, বিদেশি দূতাবাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পর্যটনপণ্য ও সেবা তুলে ধরবে। মেলায় থাকছে ‘ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ শোকেস’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম শোকেস’ এবং ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম ইনভেস্টমেন্ট শোকেস’। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য, আন্তর্জাতিক পর্যটন সম্ভাবনা এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হবে। এ ছাড়া মেলায় ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে বিটুবি (ব্যবসা-টু-ব্যবসা) সেশন, সেমিনার, ডেস্টিনেশন প্রেজেন্টেশন, প্যানেল আলোচনা, প্রোডাক্ট প্রমোশন ও নেটওয়ার্কিংয়ের আয়োজন রাখা হয়েছে। মেলার তিন দিনই সন্ধ্যায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা থাকবে। আয়োজকদের আশা, এসব আয়োজনের মাধ্যমে পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য ও সেবা আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

আইসিসিবিতে তৃতীয় সপ্তাহে ‘সুপার সেল কার বাজার’, থাকছে নানা মডেলের যানবাহন
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) শুক্রবার আবারও বসছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। প্রথম দুই সপ্তাহের আয়োজনের পর তৃতীয় সপ্তাহেও সকাল ১০টা থেকে চলবে গাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনাবেচার এই আয়োজন। নতুন, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি, মোটরবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন দেখার ও কেনাবেচার সুযোগ থাকছে এখানে। রাজধানীতে গাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনাবেচার জন্য নিয়মিত একটি বাজার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন এখন থেকে প্রতি শুক্রবার আইসিসিবিতে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। আয়োজকেরা জানান, শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে আইসিসিবিতে শুরু হবে এবারের আয়োজন। এতে নতুন, পুরোনো ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির পাশাপাশি মোটরবাইক ও ইউটিলিটি ভেহিকেল প্রদর্শন ও কেনাবেচার সুযোগ থাকবে। এক জায়গায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের যানবাহন দেখার সুযোগ থাকায় ক্রেতারা নিজেদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী গাড়ি বা মোটরসাইকেল বেছে নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মডেলের মধ্যে তুলনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবহৃত গাড়ি ও মোটরসাইকেল বিক্রির সুযোগও থাকছে। আয়োজকদের ভাষ্য, দেশের অটোমোবাইল বাজারে যানবাহনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জন্য নিয়মিত একটি আধুনিক মার্কেটপ্লেসের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। সেই প্রয়োজন বিবেচনায় ‘সুপার সেল কার বাজার’ আয়োজন করা হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ডিলারশিপ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অটোমোবাইল খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল কেনাবেচার সুযোগও রাখা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের আশা, নিয়মিত আয়োজনের ফলে ক্রেতারা একই স্থানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন সম্পর্কে তথ্য নেওয়া ও তুলনা করার সুযোগ পাবেন। অন্যদিকে বিক্রেতারাও সরাসরি সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাবেন। ‘সুপার সেল কার বাজার’ আয়োজন করছে উইজার্ড শোবিজ। আয়োজনে ভেন্যু পার্টনার হিসেবে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি)। শুক্রবারের আয়োজনটি সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

জ্বালানি আমদানির দরপত্রে এজাজ বলয়ের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অবসরের পরই যুক্ত হয়েছেন বেসরকারি একটি ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে। তাঁদের কেউ ছিলেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কিংবা এর অধীন তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। কেউ সরাসরি জ্বালানি ক্রয় ও বিপণনের সঙ্গে কাজ করেছেন, আবার কেউ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিলেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সাবেক কর্মকর্তার একটি অংশ অবসরের পর ডা. এজাজুর রহমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত হয়েছেন। বিপিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিপিসি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন—এমন অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা কোনো না কোনো সময়ে এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন বা যুক্ত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরিতে থাকার সময় অর্জিত জ্বালানি ক্রয়, দরপত্র, সরবরাহকারী নির্বাচন, মূল্য নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অবসরের পর কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে কি না। অনুসন্ধানে এজাজের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপিসির কার্যালয়ের ভৌগোলিক নৈকট্যের তথ্যও পাওয়া গেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় একই ভবন থেকে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের করপোরেট কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। ওই ভবনেই বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। একই ভবনে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং বিপিসির তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকা আইনত নিষিদ্ধ—এমন সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তবে জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, দরপত্র ও মূল্যসংক্রান্ত গোপনীয় তথ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এমন নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি দরপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দর, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সামান্য ব্যবধানেও কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিপিসির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এজাজ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক বলয় বিভিন্ন দরপত্রে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে থাকে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। বিপিসির সরবরাহকারী তালিকা পর্যালোচনা করলে এজাজের ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বিপিসির তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। সেভেন মার্কের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ইউনিপেক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনের প্রতিনিধিত্ব করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো পৃথক হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একই বলয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীর নাম। বিপিসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে তিনি ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ডা. এজাজুর রহমান দেশের বাইরে থাকলে জ্বালানি ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি। তবে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজে তাঁর নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্বের ধরন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের সঠিক তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিপিসিসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে ওঠা সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ অবসরের পর বেসরকারি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন শেষে সংশ্লিষ্ট খাতের বড় সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না। বিপিসির কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, বিগত কয়েক বছরের কিছু দরপত্রে এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে খুব অল্প ব্যবধানে কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। তাঁদের মতে, বিষয়টি যাচাই করতে হলে গত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিড শিট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার প্রিমিয়ামের ব্যবধান, দরপত্রের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ পর্যালোচনা করলে কোনো অস্বাভাবিক প্রবণতা আছে কি না, তা বোঝা যেতে পারে। এ কারণে বিপিসির বিগত কয়েক বছরের পূর্ণাঙ্গ বিড শিট এবং টেকনিক্যাল ও ফিন্যানশিয়াল ইভাল্যুয়েশন রিপোর্ট স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। এজাজের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়েও বিপিসির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন। জি-টু-জি সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এর নিজস্ব রিফাইনারি, রিফাইনারিতে মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন। বন্দরসংক্রান্ত নথির তথ্য উল্লেখ করে তাঁরা আরও বলেন, বিপিসির জন্য বিএসপি-জাপিনের নামে আসা কয়েকটি জ্বালানি চালানের উৎস ইন্দোনেশিয়া না হয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ছিল। তবে কোনো চালান কোন দেশ থেকে এসেছে, সেটিই সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ-যোগ্যতা বা চুক্তির বৈধতা প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে চুক্তির শর্ত, উৎসসংক্রান্ত অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরো বিষয়টি কেবল একজন ব্যবসায়ী বা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্ন। একই স্থানীয় এজেন্ট যদি একাধিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর প্রতিনিধিত্ব করে, আবার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা অবসরের পর সেই এজেন্টের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং একই ব্যবসায়িক বলয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে সরকারি কার্যাদেশ পেতে থাকে—তাহলে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তারা কখন অবসর নিয়েছেন, কখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল এবং তাঁদের নতুন কর্মস্থলের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে কী ধরনের সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছে—এই তথ্যগুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে সম্ভাব্য সম্পর্কের চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পণ্য। তাই এ খাতে কম দামে পণ্য কেনার পাশাপাশি সরবরাহের নিরাপত্তা, সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের অবসরের পর একই ব্যবসায়িক বলয়ে যোগ দেওয়ার প্রবণতা ‘রিভলভিং ডোর’ বা সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ কর্মপরিবর্তনের কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দরপত্র ও সরকারি কার্যাদেশের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নথিনির্ভর ও স্বাধীন পর্যালোচনা।

আইসিসিবিতে দেশ-বিদেশের পর্যটন পণ্য ও সেবার বিশাল প্রদর্শনী
দেশ-বিদেশ ভ্রমণের নানা আয়োজন, পর্যটন পণ্য ও সেবার প্রদর্শনী এবং পর্যটন বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে রাজধানীর বুকে শুরু হতে যাচ্ছে ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার (এটিএফ)। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা বসবে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড ও ৩০০ ফুট সড়কসংলগ্ন সুবিশাল ও নান্দনিক ভেন্যু ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি)। আধুনিক স্থাপত্য, সুবিশাল পরিসর, উন্নত অবকাঠামো, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং একই কমপ্লেক্সে নানা ধরনের আয়োজনের সুযোগ- সব মিলিয়ে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ভেন্যু হিসেবে ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে আইসিসিবি। আর সেই আভিজাত্যপূর্ণ আয়োজনের মঞ্চেই এবার দেশের পর্যটন খাতের অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার। তিন দিনব্যাপী মেলাটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে। রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও প্রশস্ততা, আধুনিকতা ও আভিজাত্যের এক অনন্য সমন্বয় আইসিসিবি। বড় আন্তর্জাতিক মেলা থেকে শুরু করে করপোরেট সেমিনার, বাণিজ্যিক প্রদর্শনী, পণ্য মেলা, কনসার্ট, পর্যটন মেলা, বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন- বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য এখানে রয়েছে একাধিক হল, উন্মুক্ত স্থান এবং প্রয়োজনীয় নানা সুবিধা। একই কমপ্লেক্সে এত বড় পরিসরে বিচিত্র ধরনের আয়োজনের সুযোগ রাজধানীতে খুবই বিরল। বিশাল হল, খোলা মাঠ, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, পার্কিং সুবিধা ও সুবিন্যস্ত প্রবেশপথ—সবকিছু মিলিয়ে আইসিসিবি কেবল একটি কনভেনশন সেন্টার নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইভেন্ট ডেস্টিনেশন। বিপুলসংখ্যক অতিথি ও দর্শনার্থীর গাড়ি পার্কিংয়ের সুযোগও আইসিসিবির অন্যতম বড় সুবিধা। বড় কোনো আয়োজনের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও পার্কিং ব্যবস্থাপনায় এই সুবিধা আয়োজক ও দর্শনার্থী—উভয়ের জন্যই বাড়তি স্বস্তি তৈরি করে। এখানে রয়েছে হেরিটেজ রেস্টুরেন্ট, বড় উন্মুক্ত মাঠ, মসজিদসহ নানা সুবিধা। ফলে কোনো আয়োজনকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটতে হয় না। একই কমপ্লেক্সে খাবার, নামাজ, প্রদর্শনী, অনুষ্ঠান ও বিনোদনের সুযোগ থাকায় পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় ও আকর্ষণীয়। বড় আয়োজনের জন্য একাধিক হল অনুষ্ঠানের ধরন, অতিথির সংখ্যা এবং আয়োজকদের প্রয়োজন বিবেচনায় আইসিসিবিতে রয়েছে বিভিন্ন আকারের একাধিক হল। বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে শুরু করে তুলনামূলক ছোট করপোরেট বা সামাজিক অনুষ্ঠান- প্রায় সব ধরনের আয়োজনের জন্যই রয়েছে উপযোগী পরিসর। হল-১-এ প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের আসনব্যবস্থা রয়েছে। হল-২ ও হল-৩-এ প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন করে এবং হল-৪-এ প্রায় ৩ হাজার ২০০ জনের ধারণক্ষমতা রয়েছে। হল-৫-এ প্রায় ৬০০ জন এবং হল-৬ বা এক্সপো জোনে প্রায় ১৫ হাজার লোকের অনুষ্ঠান করা যায়। আয়োজনের ধরন অনুযায়ী এসব হলের ভাড়াও ভিন্ন। সাধারণ হিসাবে হল-১, হল-২ ও হল-৩-এর ভাড়া প্রায় ৪ লাখ টাকা করে; হল-৪-এর ভাড়া প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা, হল-৫-এর প্রায় ২ লাখ। তবে অনুষ্ঠান, সময় ও অন্যান্য সেবার ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে। আইসিসিবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিশাল পরিসরের এক্সপো সেন্টার । এখানে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের একসঙ্গে বসার ব্যবস্থা করা যায়। ফলে বৃহৎ কনসার্ট, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বড় করপোরেট অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের আয়োজনের জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী। বৃহৎ পরিসরের এই অবকাঠামোই আইসিসিবিকে রাজধানীর অন্যান্য ইভেন্ট ভেন্যু থেকে আলাদা করেছে। একই সঙ্গে একাধিক হল ব্যবহার করে বড় কোনো আন্তর্জাতিক আয়োজন পরিচালনার সক্ষমতাও রয়েছে এখানে। এবার পর্যটনের আন্তর্জাতিক মিলনমেলা এমন একটি বহুমুখী ও বৃহৎ পরিসরের ভেন্যুতেই এবার বসছে ১৩তম এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার। সোমবার রাজধানীর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক ও এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হেলাল। সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এবারের মেলায় বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে। আইসিসিবির তিনটি হলে প্রায় ৩০০টি বুথে নিজেদের পর্যটন পণ্য ও সেবা তুলে ধরবে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। মেলায় হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্ট, এয়ারলাইনস, সরকারি-বেসরকারি পর্যটন প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি দূতাবাস ও মিশন অংশ নেবে। পর্যটন পণ্য ও সেবার প্রদর্শনীর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য থাকবে বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার। এবারের মেলায় বিশেষ আয়োজন হিসেবে থাকছে ‘ডেস্টিনেশন বাংলাদেশ শোকেজ’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরিজম শোকেজ’ এবং ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম ইনভেস্টমেন্ট শোকেজ’। পাশাপাশি থাকছে বিটুবি সেশন, সেমিনার, ডেস্টিনেশন প্রেজেন্টেশন, প্যানেল আলোচনা, প্রোডাক্ট প্রমোশন ও নেটওয়ার্কিংয়ের আয়োজন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও অনুষ্ঠিত হবে। এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ারের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, ‘এটিএফ ২০২৬ দেশি-বিদেশি পর্যটন অংশীজনদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ, পর্যটন পণ্যের প্রচার এবং বাংলাদেশে পর্যটন বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ প্রধান অতিথি মো. সামীমুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মেলা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটিএফ বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের সুযোগ দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে সহায়ক হবে। তিনি আরও বলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় মেলাটির অনুমোদন দিয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন মেলায় সার্বিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ করবে। সংবাদ সম্মেলনে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিসহ মেলার বিভিন্ন অংশীদার ও স্পনসর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। দেশ-বিদেশের পর্যটন প্রতিষ্ঠান, এয়ারলাইনস, হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এবারের এশিয়ান ট্যুরিজম ফেয়ার শুধু পর্যটন পণ্য প্রদর্শনের আয়োজন নয়; এটি একই সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ, পর্যটন প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। আর এত বড় আয়োজনের জন্য আইসিসিবির মতো সুবিশাল ও বহুমুখী ভেন্যু বেছে নেওয়া আয়োজনের ব্যাপ্তিকেই তুলে ধরে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, বিশাল পার্কিং, একাধিক হল, উন্মুক্ত স্থান, খাবার ও অন্যান্য সুবিধা—সবকিছু মিলিয়ে আইসিসিবি বড় আয়োজনকে শুধু ধারণই করে না, বরং সেটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলা, বাণিজ্যিক প্রদর্শনী, করপোরেট অনুষ্ঠান, সেমিনার ও সম্মেলনের আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে আইসিসিবি। পর্যটন মেলাসহ নানা থিমভিত্তিক মেলা ও প্রদর্শনীও এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে, বিশেষ করে শুক্রবার, এখানে গাড়ির হাটও বসে—যা ভেন্যুটির বহুমুখী ব্যবহারের আরেকটি দৃষ্টান্ত। সব মিলিয়ে রাজধানীর বুকে আইসিসিবি যেন আয়োজনের এক বিশাল জগৎ—যেখানে আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশস্ততা, আভিজাত্য, প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধা ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের সুযোগ। আর সেই রাজকীয় আয়োজনের ঠিকানাতেই আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনের জন্য মিলিত হবে দেশ-বিদেশের পর্যটনশিল্পের অংশীজনেরা।

জ্বালানি আমদানিতে প্রভাবের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে প্রতিযোগিতা
সরকার বদলেছে, বদলেছে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণের কাঠামোও। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশও গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে। এতে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতা, সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব দীর্ঘদিনের—এমন অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়িক যোগাযোগ সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি বলে দাবি করছেন খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন। বিপিসির নথি, দরপত্র ও কার্যাদেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেড। সেভেন মার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি)-জাপিন। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের নাম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের একটি বড় অংশ একই ব্যবসায়ী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মোট প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানি এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হিসাব অনুযায়ী, এটি মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ। তবে শুধু কার্যাদেশের পরিমাণ দিয়ে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম, গুণগত মান, সরবরাহের সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা ও দরপত্রের শর্তসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রশ্নটি মূলত প্রতিযোগিতার সুযোগ ও সরবরাহের ঝুঁকি নিয়ে। জুন-আগস্ট মেয়াদের একটি দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চারটি প্যাকেজে ৯ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয় বিপিসি। পিজি-১ প্যাকেজে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ইউনিপেক সিঙ্গাপুর। পিজি-২ প্যাকেজে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ৪০ হাজার টন ডিজেল এবং ৬০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টন জেট ফুয়েল সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া। পিজি-৩ প্যাকেজে দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টন ফার্নেস অয়েলের কার্যাদেশ পায় ট্রাফিগুরা। আর পিজি-৪ প্যাকেজে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টন অকটেন সরবরাহের কার্যাদেশ পায় ভিটল এশিয়া। এই চার প্যাকেজের মধ্যে তিনটির কার্যাদেশ পাওয়া ইউনিপেক ও ভিটল এশিয়ার স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেজে সম্ভাব্য মোট আমদানি ব্যয় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, বীমা, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। সাম্প্রতিক দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের উন্মুক্ত দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ৭২ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ৬ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়ামে কার্যাদেশ পেয়েছিল। একই সময়ে ভিটল এশিয়ার প্রিমিয়াম ছিল ডিজেলে ৪ দশমিক ৭৮ ডলার এবং জেট ফুয়েলে ৬ দশমিক ৮৮ ডলার। পরবর্তী জুন-আগস্ট মেয়াদের দরপত্রে ইউনিপেক ডিজেলের জন্য ১৩ দশমিক ২৫ ডলার এবং জেট ফুয়েলের জন্য ১৪ দশমিক ৮৬ ডলার প্রিমিয়াম প্রস্তাব করে। ভিটল এশিয়ার প্রস্তাব ছিল যথাক্রমে ১৩ দশমিক ১৮ ও ১৪ দশমিক ৭৮ ডলার। বিপিসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এ সময়ে প্রিমিয়াম বাড়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবের পাশাপাশি সরবরাহকারীর সংখ্যা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতাও কি প্রিমিয়াম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে একই সময়ের আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাজারদর এবং বিপিসির ক্রয়মূল্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা। বিপিসির নথিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দুটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী নির্ধারিত কিছু জ্বালানি সরবরাহে অপারগতা জানিয়েছিল। বিষয়টি বিপিসির বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি সীমিতসংখ্যক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতাও সংকটের সময় সমস্যা বাড়াতে পারে। কয়েকটি সরবরাহকারী একই সময়ে পিছিয়ে গেলে বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিপিসি ও এর অধীন তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও অনুসন্ধানে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিপিসি ও তেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ জন সাবেক কর্মকর্তা অবসরের পর এজাজের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের কেউ তেল ক্রয়-বিক্রয়, কেউ বিপণন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ বা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন। যমুনা অয়েল কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসির ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয় যে ভবনে, একই ভবনে এজাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যালয় রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া নিজে থেকে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগের দায়িত্ব, তাঁদের বর্তমান প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং বিপিসির সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিল কি না, তা নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নথিতে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিপিসির জন্য আসা কয়েকটি জ্বালানি চালান ইন্দোনেশিয়া থেকে নয়, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে এসেছে বলে জানা গেছে। তবে তৃতীয় দেশের বন্দর ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ করা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। মূল বিষয় হলো, সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করেছিল কি না এবং সে বিষয়ে কী ধরনের নথি জমা দেওয়া হয়েছিল। সরকার জ্বালানি সরবরাহের উৎস বাড়ানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, সরবরাহকারীদের যোগ্যতা নিয়মিত যাচাই এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত আছে কি না তা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, কোনো ব্যক্তি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতায় হস্তক্ষেপ করলে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রের প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে এতে জ্বালানি সরবরাহে দেশের ঝুঁকি কতটা কমছে বা বাড়ছে, সেটিও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

রামপালের কয়লা দরপত্রে সব প্রতিষ্ঠান কি সমান সুযোগ পাচ্ছে?
রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লা আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল)–এর চিফ প্রকিউরমেন্ট অফিসার এস এম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা, দরপত্রের শর্ত প্রয়োগে অসম আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানির এই দরপত্র ঘিরে শিল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সূত্রগুলোর অভিযোগ, দরপত্র মূল্যায়নে লিয়্যানেক্স, মোহিত মিনারেলস ও লোশে শিপিংয়ের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়লা সরবরাহের অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা এবং দরপত্রের শর্ত পূরণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের একজনের দাবি, সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান লিয়্যানেক্স প্রয়োজনীয় কারিগরি নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবে ত্রুটি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দরপত্রের শর্ত সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। দরপত্রের ক্ষেত্রে ‘মাইন এমওইউ’ বা কয়লার উৎসসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক ও নথিপত্রের যাচাই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দরদাতাদের দেওয়া এসব নথির সত্যতা সংশ্লিষ্ট খনি মালিক বা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার যেসব খনি থেকে কয়লা সরবরাহের কথা বলা হচ্ছে, সেসব খনির প্রকৃত মালিকানা, উৎপাদন সক্ষমতা, কয়লার মান এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ কয়লা সরবরাহের সামর্থ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, শুধু একটি সমঝোতা স্মারককে কয়লার উৎস ও সরবরাহ সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট খনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য খনি মালিকের অফিসিয়াল ও অনুমোদিত ই-মেইল বা যোগাযোগের মাধ্যমে নথিগুলো যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। কারণ, নির্বাচিত কোনো সরবরাহকারী চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। এস এম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, একটি পক্ষকে সুবিধা দিতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা দরপত্রের স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে জাহিদ হাসানের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং এ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দরপত্রের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে তাঁর নিজ জেলা নওগাঁয় নদীর পাড়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে সম্পদ বিবরণী, মালিকানা-সংক্রান্ত নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো যাচাই না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। ৮০ লাখ মেট্রিক টন কয়লার এই দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিটি দরদাতার কারিগরি, আর্থিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা একই মানদণ্ডে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে প্রতিটি মাইন এমওইউয়ের সত্যতা সংশ্লিষ্ট খনি মালিক বা অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। কয়লার উৎপাদন সক্ষমতা, মান, সরবরাহের পরিমাণ এবং চুক্তির বৈধতাও যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দরপত্রের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন হলে নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের দাবি উঠেছে। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নেরও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, কয়লার নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই কয়লা সরবরাহকারী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নয়, যাচাইযোগ্য নথি, প্রমাণিত সক্ষমতা এবং স্বচ্ছ প্রতিযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে বকেয়া, জ্বালানি ঘাটতি ও নীতির টানাপোড়েন
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত দেড় দশকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা মোটামুটি সচল ছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতিতে নতুন কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সময়ে বিদ্যুৎ খাত সংস্কারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহসংক্রান্ত বিশেষ বিধানের পরিবর্তন এবং নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের কার্যকারিতা নিয়ে পরিবর্তন আনা হয়। একই সময়ে পাইপলাইনে থাকা বেশ কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। দাবি করা হচ্ছে, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল কয়েক হাজার মেগাওয়াট। পরবর্তী সময়ে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্পষ্টতা এবং রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার বিষয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তবে প্রকল্প বাতিল ও নতুন দরপত্রের ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি ছিল—বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কমানো, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং আগের ব্যবস্থার অনিয়ম দূর করা। বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বকেয়া বিল। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন তথ্য ও খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পাওনা বড় অঙ্কে পৌঁছেছে। বিশেষ করে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধে বিলম্ব হলে জ্বালানি কেনা ও কেন্দ্র পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কয়লা ও গ্যাসের মূল্য পরিশোধে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অর্থের সংস্থান না থাকলে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না। ফলে উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়তে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এলএনজি-সংক্রান্ত একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিটি নিয়ে জ্বালানি খাতে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার সম্পৃক্ততা এবং প্রচলিত ক্রয়প্রক্রিয়ার বিষয়গুলো কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতাকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়ে পরিবেশবাদীদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটি বন্ধ বা বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু একটি সরকারের সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন জ্বালানি খাতের অনেক পর্যবেক্ষক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অতিরিক্ত সক্ষমতা, গ্যাসের ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সংকটকে তীব্র করতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া প্রকল্প বাতিল, নতুন দরপত্র এবং বকেয়া ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান পরিস্থিতিকে কতটা প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বাতিল হওয়া কিছু নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, সময়মতো বকেয়া পরিশোধ এবং দেশীয় ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন।

জ্বালানি সংকটে বিপুল অর্থের ক্ষতি, বেসরকারি খাতকে স্বাগত জানানোর উদ্যোগ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামার কারণে গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পেট্রোবাংলাকে উচ্চ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপরও বাড়ছে চাপ। বিপিসি-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় গত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধানই এ লোকসানের অন্যতম কারণ। একইভাবে এলএনজি আমদানিতেও ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাবে, নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে গত ছয় মাসে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের কারণে এ অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। তেলের পাশাপাশি গ্যাসের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের এমন অস্থিরতা সরাসরি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা ও উৎপাদন কার্যক্রমেও পড়ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজারে কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন ব্যবস্থায় বিপিসির প্রধান ভূমিকা ছিল। এখন সেই ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে আরও বেশি যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজার আংশিকভাবে উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি বাজারে একক নির্ভরতা কমানো গেলে সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লে আমদানি, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাস্বার্থ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে সরকারের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমানো। এ জন্য বাজার সংস্কার, বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি বাজারের এই পরিবর্তন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নীতিমালার বাস্তবায়ন, বাজার তদারকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর। তবে বর্তমান সংকট সামাল দিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার উদ্যোগকে জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ পাচ্ছে বেসরকারি খাত
জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন করতে নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করার সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেসরকারি খাতকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পেট্রোলিয়াম ব্যবসায় যুক্ত করার সুযোগ রেখে নতুন একটি নীতিমালা তৈরির দায়িত্ব বিপিসিকে দেওয়া হয়েছে। নীতিমালা প্রণয়নের পর তা বাস্তবায়নের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে দেশের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি, মজুত, বণ্টন ও বাজারজাতকরণের বড় অংশই বিপিসির নিয়ন্ত্রণে। দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন পরিশোধিত ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করা হয়। বেসরকারি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধন বা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের উৎপাদিত জ্বালানি খুচরা বাজারে সরাসরি বিক্রির সুযোগ নেই। এসব জ্বালানি বিপিসির কাছে বিক্রি করতে হয়। বর্তমান ব্যবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ফার্নেস অয়েল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ সীমিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বেসরকারি খাতকে নিয়ন্ত্রিত পরিসরে জ্বালানি ব্যবসায় যুক্ত করা হলে দেশের জ্বালানি মজুতের অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান টার্মিনাল, সংরক্ষণাগার, পরিবহনব্যবস্থা ও বিনিয়োগও কাজে লাগানো সম্ভব হবে। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণে একক নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিভিন্ন সময়ে তেল চুরি, অপচয় ও ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। বাজারে একাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতায় যুক্ত হলে এসব অনিয়ম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দেশের এলপিজির চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি খাত পূরণ করছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রিতভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে সরবরাহব্যবস্থায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম ভারতের উদাহরণ দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশগ্রহণে জ্বালানি বাজার উদারীকরণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তবে তাঁর মতে, বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর ও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁদের মতে, বিপিসির পরিবর্তে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আসতে পারে। ইতোমধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপসহ অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি তেল আমদানি ও বাজারজাতকরণের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আরও বেসরকারি বিনিয়োগকারী এ খাতে আসতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তবে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য স্থিতিশীলতা, আমদানির মান, মজুত সক্ষমতা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির পাশাপাশি কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নতুন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে কতটা নিশ্চিত হবে জ্বালানি নিরাপত্তা
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করেছে সরকার। এতে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। সরকারের কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল বা ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির কথাও বলা হয়েছে। তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কীভাবে দূর করা হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং এসব সংস্কার কখন ও কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—এ বিষয়ে ফ্রেমওয়ার্কে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার অর্থ শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বাড়ানো, স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার না করে নতুন প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সরকারের হিসাবে, বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে। অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতিতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনগুলো কম ব্যবহার হচ্ছে এবং কোন কেন্দ্র বন্ধ, পুনর্গঠন বা আধুনিকায়ন করা দরকার। পুরোনো অতিরিক্ত সক্ষমতার সমস্যার সমাধান না করে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হলে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা আরও বাড়তে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দক্ষতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার জরুরি। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির পাশাপাশি একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজও শুরু করা প্রয়োজন। এদিকে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এলএনজি আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন। জ্বালানি আমদানিতে দেশের বার্ষিক ব্যয় ইতিমধ্যে ১৩ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এলএনজি আমদানির পরিমাণ আরও বাড়লে এই ব্যয় ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ভোলার গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভোলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত আবিষ্কৃত হয়েছে। এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অর্থায়ন জোগাড় না হওয়ায় প্রকল্পটি এগোয়নি। অন্যদিকে ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা গেলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এতে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের ব্যবহারও বাড়ানো যেত। বিপিডিবির আর্থিক দুর্বলতাও বিদ্যুৎ খাতের বড় সমস্যা। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। উৎপাদন ও ক্রয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পক্ষের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের দায়িত্বও এর ওপর রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বিপিডিবির নিজস্ব অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব কেন্দ্র ও বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি যথাযথভাবে পরিকল্পনায় না নেওয়া। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাশিয়ার অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো উৎপাদনে আসেনি। কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় একাধিকবার পিছিয়েছে। এর মধ্যে নতুন আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা উন্নয়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি ও এলএনজিনির্ভর নতুন অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ করলে জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য তৈরি নাও হতে পারে। উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোটের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান হিসেবে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে একমাত্র পথ হিসেবে দেখা টেকসই নয়। তাঁর মতে, বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি রূপরেখা। তাই এতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, ফ্রেমওয়ার্কে মূলত কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়নের সময় কোথায় সমস্যা হচ্ছে এবং কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা সম্ভব হবে। সরকারের এই রোডম্যাপে তাই একদিকে যেমন নতুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্ষমতা ও আর্থিক চাপও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে তার ওপর।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমার আভাসে কমেছে তেলের দাম
রাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কমে আসায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। বুধবার (২৭ আগস্ট) এশিয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের নজর ছিল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার আর্থিক প্রতিবেদন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে। এর মধ্যেই চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুই ধরনের দামই ৮ শতাংশের বেশি কমেছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালী আংশিকভাবে পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত বাজারে স্বস্তি তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরান ও দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করলেও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, পদক্ষেপগুলো আশঙ্কার তুলনায় কম কঠোর হতে পারে। বিএনজির বিশ্লেষক জেসন ওয়ং বলেন, সর্বশেষ মার্কিন পদক্ষেপের ফলে ইরানের আর্থিক সক্ষমতার পথগুলো আরও সংকুচিত হতে পারে। এতে তেহরান আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারে এবং চলমান সংঘাত নিরসনের পথ তৈরি হতে পারে। বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি কমেছে। এতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে। তেলের দাম কমায় পুঁজিবাজারেও চাপ কিছুটা কমেছে। গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সূত্র- আমার সংবাদ