সেন্টমার্টিন ভ্রমণে বদল আসছে নীতিমালায়, রাত্রিযাপন নিয়ে নতুন ভাবনা

কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত ও ভ্রমণসংক্রান্ত বর্তমান বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে পর্যটকদের রাত্রিযাপন এবং দ্বীপে ভ্রমণের সময়সীমা নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবিদ ও পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, দ্বীপটির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেই নতুন গাইডলাইন তৈরি করা হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পর্যটকদের ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, ওই বিধিনিষেধের কারণে গত এক বছরে দ্বীপের পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাদের ভাষ্য, পর্যটক কমে যাওয়ায় জীবিকার প্রয়োজনে কিছু মানুষ গাছ কাটার পাশাপাশি অবাধে মাছ ধরার মতো কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।
এ কারণে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা বিদ্যমান বিধিনিষেধ দ্রুত শিথিল বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগের ১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে যেসব বিধিনিষেধ যৌক্তিক, সেগুলো রাখা হতে পারে।
সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের আকর্ষণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক সেখানে যাতায়াত করতেন।
পর্যটকদের থাকার সুবিধার জন্য দ্বীপটিতে গড়ে উঠেছে বহু হোটেল ও রিসোর্ট। সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদীর তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপে প্রায় ১৫০টি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে অন্তত পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ১২ দফা বিধিনিষেধে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে নির্দিষ্টসংখ্যক পর্যটককে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আর নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ঘুরে দেখার সুযোগ ছিল, রাতে থাকার অনুমতি ছিল না।
বর্তমান সরকার এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। বিশেষ করে রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ছয়-সাত ঘণ্টা ভ্রমণ করে সেন্টমার্টিন গিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে আবার একই সময় ধরে কক্সবাজারে ফিরে আসা পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থা নয়।
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু একমত হয়েছেন। আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ট্যুর অপারেটরদের সংগঠনও সেন্টমার্টিনে রাত কাটানোর বিধিনিষেধ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, রাত্রিযাপনের নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকদের মধ্যে সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আগ্রহ কমেছে। কক্সবাজার থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একজন পর্যটক মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য দ্বীপে যাবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপনের সুযোগ রয়েছে। তবে রাত কাটাতে পারবেন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক। এ জন্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পর্যটকদের পাস দেওয়া হয়।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এই নিয়মেই সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত চলছে। নীতিমালায় পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত নির্ধারিত দুই হাজারের বেশি পর্যটক সেখানে গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন না।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপটিতে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা গড়ে উঠেছে। হঠাৎ করে বিধিনিষেধ আরোপের কারণে পর্যটন ব্যবসায় এর প্রভাব পড়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
তবে পর্যটকের সংখ্যা কিংবা ভ্রমণের সময়সীমা বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, কোন সময় থেকে কোন সময় পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন, কতজন পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারবেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা কী এবং পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা কতটুকু—এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে শুনানি বা বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার পর আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন গাইডলাইন দেওয়া হবে। এতে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দ্বীপের বাসিন্দাদের স্বার্থও বিবেচনায় রাখা হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, আগে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ছয় মাস সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ভ্রমণের সুযোগ ছিল। পরে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হলে তারা সেটি পরিবর্তন করে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটন চালুর দাবি জানান।
তবে পরিবেশবিদদের কেউ কেউ স্থানীয়দের এই দাবির সঙ্গে একমত নন। পরিবেশবিদ মো. শামসুদ্দোহা মনে করেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের যাতায়াতের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। তার মতে, পর্যটনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত এবং সেটি তিন মাসের বেশি হওয়া উচিত নয়।
আগের বিধিনিষেধে সেন্টমার্টিনে আলোকসজ্জাসহ বারবিকিউ পার্টি, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো এবং শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ কিংবা কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করাও নিষিদ্ধ ছিল।
সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরচালিত যানবাহন চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ফয়েজুল ইসলাম মনে করেন, এসব বিধিনিষেধ পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তার দাবি, পর্যটক কমে যাওয়ায় দ্বীপের মানুষের পর্যটননির্ভর কাজ কমেছে। ফলে কেউ কেউ গাছ কেটে বিক্রি করছেন এবং জীবিকার জন্য অবাধে মাছ ধরছেন, যা পরিবেশের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়।
তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থায় প্লাস্টিক ও সিঙ্গেল-ইউজ পলিথিন নিয়ন্ত্রণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। পর্যটকরা যাতে এসব সামগ্রী নিয়ে দ্বীপে যেতে না পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ড সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এসব সামগ্রী পরীক্ষা করে জাহাজ ছাড়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
নতুন নীতিমালায় সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা এবং পর্যটন ব্যবসার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখার কথা জানিয়েছে সরকার।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



