শৈশবের মানসিক আঘাত বড় বয়সের প্রেম ও সম্পর্ককে যেভাবে প্রভাবিত করে

শৈশবের অভিজ্ঞতা মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। বাবা-মায়ের ভালোবাসা, যত্ন, নিরাপত্তা কিংবা অবহেলার অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ধরনকে প্রভাবিত করে। ছোটবেলায় বারবার অবহেলা, প্রত্যাখ্যান বা নির্যাতনের শিকার হলে তার প্রভাব বড় বয়সের প্রেম, বন্ধুত্ব ও দাম্পত্য জীবনেও দেখা দিতে পারে।
কেউ একা থাকার ভয় থেকে বারবার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কেউ আবার ঘনিষ্ঠতা বাড়লেই অস্বস্তি বোধ করেন। আবার প্রিয় মানুষকে হারানোর আশঙ্কা থেকে কারও মধ্যে তৈরি হতে পারে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। এসব আচরণের পেছনে বর্তমান জীবনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শৈশবের মানসিক আঘাতও ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মনোবিষয়ক সাময়িকী ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত এক নিবন্ধে শৈশবের মানসিক আঘাতের সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সম্পর্কের যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে।
শৈশবের অভিজ্ঞতা যেভাবে সম্পর্কের ধরন গড়ে তোলে
শৈশবে বাবা-মা বা যত্নদাতার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই শিশু অন্যের ওপর আস্থা রাখা, অনুভূতি প্রকাশ করা এবং নিরাপত্তা খোঁজার প্রাথমিক ধারণা পায়। শিশুর প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল সাড়া, আবেগের স্বীকৃতি এবং নির্ভরযোগ্য আচরণ তার মধ্যে নিরাপদ সম্পর্কের ধারণা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো শিশু নিয়মিত অবহেলা, অপমান, নির্যাতন কিংবা আবেগীয় অনুপস্থিতির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হলে তার মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। সে ভাবতে পারে, নিজের প্রয়োজনের কথা জানালে অন্যরা বিরক্ত হবে, ভালোবাসা পেতে হলে সব সময় অন্যকে খুশি রাখতে হবে, কিংবা কাছের মানুষ যেকোনো সময় তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে।
তবে শৈশবের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা সবার ওপর একই রকম প্রভাব ফেলে না। ব্যক্তির স্বভাব, পারিবারিক পরিবেশ, পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সহায়তা পাওয়ার সুযোগের ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করে।
অ্যাটাচমেন্ট ট্রমা কী?
অ্যাটাচমেন্ট ট্রমা বা সংযুক্তিজনিত মানসিক আঘাত বলতে শৈশবে বাবা-মা কিংবা প্রধান যত্নদাতার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তৈরি হওয়া গভীর মানসিক ক্ষতকে বোঝানো হয়। বিশেষ করে শিশু যখন বারবার অবহেলা, প্রত্যাখ্যান বা নির্যাতনের শিকার হয় এবং সেই অভিজ্ঞতা কাটিয়ে ওঠার মতো সহায়তা পায় না, তখন তার মানসিক বিকাশে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাবা-মায়ের প্রতিটি ভুল বা সাময়িক অবহেলাই মানসিক আঘাত নয়। কোনো অভিভাবক ব্যস্ততার কারণে একদিন সন্তানের কথা শুনতে না পারলে কিংবা রাগ করে বকাঝকা করলে তাতেই সম্পর্কের স্থায়ী ক্ষতি হবে, এমন নয়। বরং এমন অভিজ্ঞতা কতটা ঘন ঘন ঘটছে এবং পরে সম্পর্কের মধ্যে বোঝাপড়া ও ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।
বারবার নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে শিশুর নিজের সম্পর্কে ধারণা দুর্বল হতে পারে। বড় হওয়ার পরও সে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহ করতে পারে কিংবা অন্যের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করতে পারে।
বড় বয়সের সম্পর্কে যেসব প্রভাব দেখা দিতে পারে
একা থাকার ভয়
কেউ কেউ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় এমন সম্পর্কেও থেকে যান, যেখানে সম্মান বা মানসিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। একাকিত্বের ভয় থেকে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
অতিরিক্ত সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা
প্রিয় মানুষ দেরিতে ফোন ধরলে কিংবা ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে না পারলে কারও মনে হতে পারে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা কমে যাচ্ছে। অতীতের প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা বর্তমান সম্পর্কের ছোট ঘটনাকেও বড় আশঙ্কা হিসেবে অনুভব করাতে পারে।
ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলা
সবাই যে সম্পর্কে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তা নয়। কেউ কেউ আবেগীয় ঘনিষ্ঠতাকেই ভয় পেতে পারেন। অন্যের ওপর নির্ভর করলে আবার আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা থেকে তাঁরা নিজের অনুভূতি গোপন রাখেন কিংবা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখেন।
বারবার অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া
কখনো কখনো মানুষ পরিচিত আচরণের প্রতি আকৃষ্ট হন, এমনকি সেই আচরণ তাঁর জন্য কষ্টকর হলেও। শৈশবে অনিশ্চয়তা বা অবহেলার অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তী জীবনে একই ধরনের সম্পর্ক পরিচিত বলে মনে হতে পারে। তবে সব অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের পেছনে শৈশবের মানসিক আঘাতই দায়ী নয়।
কেন একই ধরনের অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে আসে?
মানসিক আঘাত নিয়ে গবেষণা করা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক বেসেল ভ্যান ডার কোলকের আলোচনায় উঠে এসেছে, আঘাতের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া কিছু মানুষ অবচেতনভাবে এমন পরিস্থিতির দিকে আকৃষ্ট হতে পারেন, যা তাঁদের পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
অবহেলা, পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি, নির্যাতন কিংবা আবেগীয় নিরাপত্তার অভাবের মতো অভিজ্ঞতা কাটিয়ে ওঠার যথাযথ সহায়তা না পেলে পরবর্তী জীবনে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার প্রভাব থাকতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে মানুষ ইচ্ছা করেই কষ্টকর সম্পর্ক বেছে নেন। বরং পরিচিত আচরণ ও সম্পর্কের ধরন কখনো কখনো অজান্তেই তাঁদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে।
তবে এসব আচরণ স্থায়ী ভাগ্য নয়। শৈশবের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের অনুভূতি বুঝতে শেখা এবং স্বাস্থ্যকর সম্পর্কের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে পুরোনো ধারা পরিবর্তন করা সম্ভব।
সুস্থ সম্পর্ক গড়তে কী করবেন?
প্রথমত, নিজের আচরণের ধরন লক্ষ করুন। সম্পর্কের মধ্যে কোন পরিস্থিতিতে ভয়, সন্দেহ, রাগ বা দূরত্ব তৈরি হয়, তা বোঝার চেষ্টা করুন। একই ধরনের সমস্যা বারবার দেখা দিলে নিজেকে দোষারোপ না করে এর পেছনের কারণ খুঁজুন।
দ্বিতীয়ত, নিজের অনুভূতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে শিখুন। প্রিয় মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন জানানো, ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সুস্থ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তৃতীয়ত, এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যাঁরা আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন এবং ভুল বোঝাবুঝির পর তা সমাধানের চেষ্টা করেন। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অপমান বা নির্যাতন সহ্য করা প্রয়োজন নেই।
শৈশবের অভিজ্ঞতা যদি বর্তমান সম্পর্ককে বারবার কষ্টকর করে তোলে, তাহলে মনোবিজ্ঞানী বা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। উপযুক্ত সহায়তা নিজের আবেগ বুঝতে, পুরোনো অভ্যাস পরিবর্তন করতে এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, শৈশবের মানসিক আঘাত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও তা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না। অতীতের অভিজ্ঞতা বুঝতে পারা এবং নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



