এআই একশ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, সতর্ক করলেন বিল গেটস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যদি অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা একশ কোটির বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। শুক্রবার এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
গেটসের ভাষায়, ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে সর্বাধুনিক এআই প্রযুক্তির সম্মিলিত ব্যবহার এমন এক ধরনের ধ্বংসাত্মক শক্তি তৈরি করতে পারে, যার নজির মানব ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। তার মতে, এআই নিঃসন্দেহে এমন ঘটনা ঘটানোর ক্ষমতা রাখে, যা একশ কোটি মানুষের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তবে এই মাত্রার বিপর্যয় ঘটবেই—এমন নিশ্চয়তা তিনি দেননি, বরং বলেছেন এটি শতভাগ নিশ্চিত নয়। তার কথায়, এত শক্তিশালী কোনো প্রযুক্তি এর আগে কখনো অসৎ উদ্দেশ্যধারী কোনো ব্যক্তির হাতে পড়েনি, আর এখানেই মূল উদ্বেগের জায়গা।
এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারগুলোকে এ বিষয়ে শক্তিশালী আইন তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন গেটস। তার মতে, প্রযুক্তির যে গতিতে বিকাশ ঘটছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, রাজনীতিকদের এই আলোচনায় সম্পৃক্ত করে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা মজবুত করতে হবে। এতে করে সংশ্লিষ্টদের কাজের চাপ কিছুটা বাড়বে ঠিকই, তবে এতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের গতি থমকে যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গেটসের এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন এআই এজেন্টের আচরণ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। এর আগে ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইও এআই প্রযুক্তির ওপর আরও শক্তিশালী সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
এর আগেও গেটস সতর্ক করেছিলেন যে এআই একদিকে যেমন মানবসমাজে বড় ধরনের সমতা আনতে পারে, তেমনি এটি বৈষম্যের অন্যতম বড় উৎসও হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জীবাণু-সন্ত্রাসের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, দুষ্কৃতকারীরা যদি ওপেন-সোর্স এআই ব্যবহার করে জৈবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে তা বিশ্বব্যাপী গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তুরিং ইনস্টিটিউটের রিপোর্টেও একই ধরনের সতর্কতা
গেটসের এই মন্তব্যের কিছুদিন আগেই ব্রিটেনের অ্যালান টুরিং ইনস্টিটিউট একটি প্রতিবেদনে গোটা বিশ্বকে সতর্ক করেছিল। প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল—ফ্রন্টিয়ার এআই আসন্ন সময়ে বিশ্বাসযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করছে, যার জন্য প্রয়োজন ব্যবহারিক গবেষণা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সামগ্রিক ব্যবস্থার যাচাই ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। প্রতিবেদনে বলা হয়, এআইয়ের সক্ষমতা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অতি বুদ্ধিসম্পন্ন এআইয়ের আবির্ভাবের সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মত বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ কাজে ও জ্ঞানের নিরিখে এআই মানুষকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, আর এআই নিজস্ব কৌশল তৈরি করতে সক্ষম হলে তার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নাও থাকতে পারে। প্রতিবেদনটিতে শুধু তথ্য পরিবেশ বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঝুঁকির কথাই নয়, এআই দিয়ে রাসায়নিক ও জৈবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়।
অ্যানথ্রপিকের সাবেক কর্মীদেরও একই শঙ্কা
অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগ করার পর সংস্থাটির সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন দাবি করেছিলেন, চলতি দশকের শেষ নাগাদই এআইয়ের কারণে মানবজাতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। প্রতিষ্ঠানটির অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান ইভান হাবিঙ্গারও আগামী এক দশকের মধ্যে এমন ঘটনার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি বলে মন্তব্য করেছেন। এর আগে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই ফ্রন্টিয়ার এআইয়ের উন্নয়নে সাময়িক বিরতি, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মূল্যায়ন, অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং চীনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এআইয়ের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত এর আগে দিয়েছেন খোদ ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যানও। এমনকি ধনকুবের ইলন মাস্কও এআইয়ের অগ্রগতির গতি কমিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো বিল গেটসের নামও, যিনি এই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরলেন।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



