📍 কিশোরগঞ্জ | লোড হচ্ছে...
শিক্ষা

শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের উদ্যোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক / কিশোরগঞ্জ জার্নাল ৩ নভেম্বর, ২০২৬
শেয়ার:
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের উদ্যোগ, কারণ দর্শানোর নোটিশ
📷 ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড। জবাব সন্তোষজনক না হলে টানা দুই বা তার বেশি বছর শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও করছে সরকার। গত শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। এ বছর মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ফলাফলের অবনতির পাশাপাশি বেড়েছে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এবার এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি, গত বছর যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি। এর আগে ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। সেই হিসাবে ছয় বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ২৯১টি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি, সেগুলোর বেশির ভাগই কাগুজে প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থী নেই। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। ফলে অধিকাংশ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, দেশের অনেক এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন না থাকলেও কিছু ব্যক্তি মিলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। কয়েক বছর পর এমপিওভুক্ত হলে চাকরি নিশ্চিত হবে—এমন উদ্দেশ্যও থাকে অনেকের। উত্তরবঙ্গে এ ধরনের প্রবণতা বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ না থাকায় শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না। কেউ ভর্তি হলেও ভালো ফল করতে পারে না। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ থেকে চলতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ জন। তাদের জন্য কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ জনের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই অনিয়মিত। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি কারখানা কিংবা দোকানে কাজ করে। তাদের ধরে ধরে এনে ক্লাস করাতে হয়। এ কারণে এখানকার ফলাফল এত খারাপ।’ নেত্রকোনা জেলা সদরে অবস্থিত নন-এমপিওভুক্ত ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজের অবস্থাও একই রকম। টানা দুই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। চলতি বছর কলেজটি থেকে চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। আগের বছরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেননি। কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু বলেন, ‘এটি নন-এমপিও কলেজ। এখানে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। যখন যাকে প্রয়োজন, ডেকে আনা হয়। সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধাও এখানে নেই।’ এ ছাড়া গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ এবং সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকেও এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। ফকিরহাট মহিলা কলেজ থেকে দুজন এবং জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এর মধ্যে ফকিরহাট মহিলা কলেজের কোনো পরীক্ষার্থী টানা তিন বছর ধরে পাস করতে পারছেন না। ফকিরহাট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবার রহমান রশিদ বলেন, ‘এ বছর মানবিক বিভাগ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে দুজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের কেউ পাস করেনি। ২০০০ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত শুধু পাঠদানের অনুমোদন পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হয়নি। অনেক শিক্ষকই এমপিওর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাই তারা প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তাদেরও তো সংসার আছে। বিনা বেতনে কতদিন পড়াবেন। এ কারণে ফলাফল ভালো করা সম্ভব হচ্ছে না।’ অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সীমিত পরিসরে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে বলে নিশ্চিত করেন তিনি।’ সার্বিক বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর জন্য আজ চিঠি দেওয়া হবে। বিগত ৫ বছরের শিক্ষার্থী, পাসের হার, শিক্ষকদের তথ্য নিয়ে আসতে বলা হবে। তাদের জবাবের পর এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিকবার শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করব।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘দুবারের বেশি যেসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, তাদের এমপিও বাতিল করার চিন্তা রয়েছে। আর নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেওয়া হবে না। এ ছাড়া অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে পাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।’ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি কিংবা পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন

আরও পড়ুন

আরও খবর →