পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোর ৮টি কার্যকরী উপায়

সামনে পরীক্ষা কিংবা ক্লাসের পড়া, অথচ বই খুললেই যেন গোটা পৃথিবীর অলসতা এসে ভর করে। মাত্র ১০ মিনিট পড়ার পরই মোবাইলের নোটিফিকেশন চেক করা কিংবা অজান্তেই অন্য চিন্তায় হারিয়ে যাওয়া—এই সমস্যায় ভোগেননি এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া ও শর্ট ভিডিওর প্রভাবে মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা অ্যাটেনশন স্প্যান অনেকটাই কমে এসেছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থেকেও প্রত্যাশিত ফল পান না। তবে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতে, দৈনন্দিন অভ্যাসে কিছু ছোট পরিবর্তন আনলেই পড়ার টেবিলে মনোযোগ কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। চলুন জেনে নেওয়া যাক পড়াশোনায় একাগ্রতা বাড়ানোর কার্যকর আটটি উপায়।
নির্দিষ্ট পড়ার পরিবেশ তৈরি করুন
মনোযোগ ধরে রাখার প্রথম শর্তই হলো সঠিক পরিবেশ। বিছানায় শুয়ে-বসে পড়ার অভ্যাস থাকলে তা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ঘরের একটি নির্দিষ্ট কোণ বা টেবিল বেছে নিন, যেখানে কোলাহল কম এবং জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অপ্রয়োজনীয় বইপত্র বা জিনিসপত্র টেবিলে জমিয়ে রাখলে তা মনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এবং পড়ায় অনীহা বাড়িয়ে দেয়।
স্মার্টফোন ও নোটিফিকেশন থেকে দূরে থাকুন
পড়াশোনায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মোবাইল ফোন। পড়তে বসার আগে ফোন সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে রেখে আসা কিংবা ডু নট ডিস্টার্ব মোড চালু রাখা যেতে পারে। পড়ালেখার প্রয়োজনে ফোন ব্যবহার করতে হলে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখাই ভালো। পড়ার নির্ধারিত সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না ঢোকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পোমোডোরো টেকনিক কাজে লাগান
একটানা দুই-তিন ঘণ্টা পড়ার চেষ্টা না করে ছোট বিরতি নিয়ে পড়াই বেশি কার্যকর। এ জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পোমোডোরো টেকনিক ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে ২৫ মিনিট পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর নেওয়া হয় পাঁচ মিনিটের একটি ছোট বিরতি। এভাবে চারটি সাইকেল শেষ হলে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের একটি বড় বিরতি নেওয়া যায়। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্ক সহজে ক্লান্ত হয় না এবং পড়ার আগ্রহও দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে।
মুখস্থ না করে লিখে পড়ার অভ্যাস গড়ুন
শুধু চোখ দিয়ে পড়লে খুব দ্রুতই মন অন্যদিকে সরে যায়। তাই পড়ার সময় হাতে কলম বা হাইলাইটার রাখা ভালো। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আন্ডারলাইন করা বা সংক্ষিপ্ত নোট আকারে লিখে রাখলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে, ফলে মনোযোগ অন্য কোথাও হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়।
নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন
“আজ সারা রাত পড়ব”—এমন অস্পষ্ট পরিকল্পনার বদলে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা উচিত, যেমন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি অধ্যায়ের নির্দিষ্টসংখ্যক প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা। লক্ষ্য স্পষ্ট থাকলে মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ অনুভব করে, যা মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক।
পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন
ক্লান্ত মস্তিষ্ক কখনো পড়া মনে রাখতে পারে না। পড়ায় মনোযোগ অনেকাংশে নির্ভর করে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর। তাই প্রতিদিন অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে পুষ্টিকর খাবার, শাকসবজি ও পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন, কারণ পানিশূন্যতা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
অন্যকে বুঝিয়ে বলার মাধ্যমে নিজে শেখা
কঠিন কোনো বিষয় স্থায়ীভাবে মনে রাখার একটি কার্যকর উপায় হলো তা অন্য কাউকে শিখিয়ে দেওয়া বা নিজে নিজে বলে অনুশীলন করা। পড়া বিষয়টি বন্ধুকে বুঝিয়ে বলা কিংবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শিক্ষক ভেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে নিজের জানার ঘাটতি সহজেই চোখে পড়ে এবং পড়াটি মাথায় আরও ভালোভাবে গেঁথে যায়।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও মেডিটেশন করুন
প্রতিদিন সকালে বা বিকেলে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করা উচিত। নিয়মিত শরীরচর্চা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া প্রতিদিন কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মেডিটেশন করলে মানসিক ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়।
পড়াশোনায় মনোযোগ একদিনে তৈরি হয় না, এটি ধারাবাহিক অনুশীলনের বিষয়। একসঙ্গে সব কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা না করে প্রতিদিন এক-দুটি অভ্যাস রপ্ত করার চেষ্টা করাই ভালো। নিজের একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চললে দ্রুতই পড়াশোনায় একাগ্রতা ফিরে আসবে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পরীক্ষার ফলেও।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



