ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাক্কার পর মার্কিন শেয়ারবাজারে তিন মাসের সর্বোচ্চ উত্থান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাক্কার পর দেশটির শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ওয়াল স্ট্রিটে তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ উত্থান রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে তেলের দাম কমেছে এবং ট্রেজারি বন্ডের বাজারও চাঙা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কর হ্রাস, নিয়মকানুন শিথিলকরণ ও ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে ট্রাম্পকে শেয়ারবাজারের জন্য অনুকূল প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পর বাজারের এমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রথমে কিছুটা বিপরীতমুখী মনে হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের ধারণা, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্পের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত নীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক আরোপ, ঘাটতি বাজেট এবং ইরান সংঘাত। অর্থাৎ বাজার বামপন্থী নীতির পরিবর্তনের কারণে নয়, বরং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কমার সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাচ্ছে।
নির্বাচনের পর বুধবার ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দেড় হাজার পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। সূচকটি প্রায় ৩ শতাংশ এগিয়েছে। অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট বেড়েছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ভোটের পর প্রথম দিকে শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হলেও পরে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক এজেন্ডায় ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে শেয়ার কিনতে শুরু করেন। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ গত তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দৈনিক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে।
বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বিভক্ত সরকার নীতিগত বড় ধরনের পরিবর্তন সীমিত করতে পারে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং বাজারের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস থাকলে ট্রাম্পের পক্ষে বড় ধরনের কর, ব্যয় ও নীতিগত পরিবর্তন অনুমোদন করানো কঠিন হতে পারে। প্রশাসনের অনাকাঙ্ক্ষিত নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীদের কাছে এই সম্ভাবনা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব সব খাতে এক রকম নয়। ডেমোক্র্যাটরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রযুক্তি কোম্পানি ও ডিজিটাল সম্পদের ওপর কঠোর নজরদারির দাবি তুলতে পারে। এতে এআই অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা জটিল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্কনীতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হোয়াইট হাউস এই রাজনৈতিক ধাক্কায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কংগ্রেস প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন বিনিয়োগকারীরা।
### এআই ও প্রযুক্তি খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো ওয়াল স্ট্রিটের অন্যতম বড় বিনিয়োগ খাত। তবে ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের পর এআই খাতের ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল ব্যয় নিয়ে নতুন করে নজরদারির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কঠোর নিয়মকানুন, ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ কিংবা জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হলে এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ধীর হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি খাতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট (গুগল) ও মেটার মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি কমলে প্রতিষ্ঠিত ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসাগুলো সুবিধা পেতে পারে।
অন্যদিকে হাট ৮, আইআরইএন, কোর সায়েন্টিফিক ও অ্যাপ্লাইড ডিজিটালের মতো ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে। সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। টেসলার শেয়ারের দামও কমেছে।
এদিকে প্রতিরক্ষা খাতের ঠিকাদারদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে বাধার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
### তেলের দামে বড় পতন
নির্বাচনের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তেলের বাজারে। বুধবার অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯৫ ডলারে নেমে আসে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দামেও বড় পতন হয়েছে।
তেলের দামের এই পতনের পেছনে রয়েছে ইরান যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের ওপর ডেমোক্র্যাটদের চাপ বাড়ার সম্ভাবনা। এই সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছিল, যা মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াচ্ছিল। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, যুদ্ধটি রিপাবলিকানদের নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
তেলের দাম কমলে সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেতে পারেন। সস্তা জ্বালানি মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও কমাতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে তেলনির্ভর বাজারের এই ইতিবাচক পরিস্থিতি অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সমঝোতার আশার ওপর নির্ভর করছে। সেখানে সংঘাত বাড়লে বাজারের বর্তমান অর্জন দ্রুত ম্লান হয়ে যেতে পারে।
← প্রচ্ছদে ফিরে যানকিশোরগঞ্জ জার্নাল অনলাইন



