বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০১:৩১ অপরাহ্ন

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বড় দুই দলের হাইকমান্ডকে লালকার্ড দেখিয়েছেন

শাহজাহান সাজু
বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০১:৩১ অপরাহ্ন

উপজেলা নির্বাচনে দেশের বড় দুই দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হাইকমান্ডকে লালকার্ড দেখিয়েছেন। দলীয় প্রধান থেকে যাওয়া নির্দেশনাও মানছেন না তৃণমূল। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছিলেন এমপি-মন্ত্রীর স্বজনদের কেউ যেন উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী না হন। তিন ধাপে দলীয় প্রধানের নির্দেশনা উপেক্ষা করে অন্তত ৫২ জন স্বজন চেয়ারম্যান পদে এখনও ভোটের মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোটভাইও রয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপি দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেন ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে তারা আর নির্বাচনে যাবেন না। সংবাদ সম্মেলন করে চারধাপে হওয়া উপজেলা নির্বাচনও বর্জন করেন। এখন পর্যন্ত তিন ধাপে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ৭৯ জন প্রার্থী সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন এবং তৃণমূল থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীরা ঘোষণা দিয়েছেন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন তারা। যদিও ভোটে অংশ নেওয়া প্রথম ধাপে ৭২ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে অংশ নেওয়া ৬১ জনকে গতকাল বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এবং তৃতীয় ধাপে যারা অংশগ্রহণ করছেন তাদেরও আজকালের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। জবাব পাওয়া না গেলে তাদেরও বহিষ্কার করা হবে জানিয়েছেন দলটির বিশ্বস্ত সূত্র।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন-দেশের জনগণ থেকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনেও প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ ভোট দেয়নি। বিএনপি অংশ না নেওয়া প্রতিযোগীতায় প্রভাব পড়ছে। এখন শুধু এক দলের প্রভাবশালী নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতা চলছে। ভোট উৎসব কমে যাওয়ায় দেশের গণতন্ত্র সৌন্দর্য, সংস্কৃতিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষক বলছেন-স্থানীয়ভাবে অনেকে প্রভাবশালী হওয়ায় আওয়ামী লীগ হুট করেই বিদ্রোহীদের ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। টানা চারবার ক্ষমতা থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে এখন বহিষ্কারের ফলে সাংগঠনিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। অন্যদিকে এমপি মন্ত্রীদের স্বজন সংখ্যা দীর্ঘ হওয়ায় কঠোর নির্দেশনা থাকলেও শীতলভাবে হাঁটতে হচ্ছে। বিএনপি দেড় যুগেরও বেশী সময় নেতৃত্ব থেকে দূরে থাকায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তবে সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হওয়ায় পূর্বের চেয়ে হাইকমান্ডের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলেও অনেকে মনে করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা, তিন ধাপে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির নেতাদের মধ্যে প্রার্থী ৭৯ জন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২৮ জন, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ জন। তৃতীয় ধাপে ২৬ জনের নাম রয়েছে।দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় প্রথম ধাপের ৭২ জনকে ইতিমধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এরপর দ্বিতীয় ধাপে অংশ নেওয়া ৬১ প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানোর পর গতকাল তাদেরও বহিষ্কারের কথা জানায় দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশের প্রকাশ্য মদতে ৭ জানুয়ারি ডামি নির্বাচনের পর দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন। এতে গভীর সংকটে পড়েছে মানুষ। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের ভোটাধিকার আজ বিপন্ন।’ ‘দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, তথাকথিত উপজেলা নির্বাচন বর্জন করুন।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ছিল তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এই ধাপেও অন্তত ক্ষমতাসীন দলের ২৫ জন দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভোট করছেন। নোয়ায়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভাগনে (আপন বোনের ছেলে) মাহবুবুর রশীদ মঞ্জু।

এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে চেয়ারম্যান পদে স্থানীয় সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের ভাতিজা আমিনুল ইসলাম তুষার। কুমিল্লার দেবিদ্বারে স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদের ভাই যুবলীগ নেতা মামুনুর রশিদ, মুরাদনগরে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম সরকারের ছেলে ড. আহসানুল আলম কিশোর, তাঁর আপন ভাতিজার ছেলে (নাতি) আল আমিন সরকার ও ব্রাহ্মণপাড়ায় স্থানীয় এমপি এম এ জাহেরের ভাতিজা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবু তৈয়ব সরকার ।কক্সবাজারের রামুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলের বড় ভাই সোহেল সরওয়ার কাজল। উখিয়ায় স্থানীয় এমপি শাহীন আক্তারের ভাই জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী। লক্ষ্মীপুর এ কে এম সালাহউদ্দিন টিপু তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নের ফুফাতো শ্যালক। মৌলভীবাজারে কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের ছোট ভাই ইমতিয়াজ আহমদ বুলবুল।কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের ছোট বোন এবং স্থানীয় এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকের ফুপু আছিয়া আলম। পিরোজপুর-২ আসনে এমপি মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই মিরাজুল ইসলাম, পিরোজপুর ৩ আসনের সংসদ সদস্য শামীম শাহ নেওয়াজের ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দিন আহমেদ এবং বরগুনার পাথরঘাটায় প্রার্থী হয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরের চাচাতো ভাশুরের স্ত্রী নুর আফরোজ হেপি।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, স্বজন বলতে প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্টভাবে সন্তান ও স্ত্রীকে বুঝিয়েছেন, উপজেলা নির্বাচনে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রী তা পরিষ্কারভাবে বলেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগিরকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নির্বাসনে চলে গেছে। দেশের মানুষ এখন সঙ্কটের মধ্যে আছে। এজন্য নেতাকর্মীরা কেউ কারও কথা মানছেন না। বাংলাদেশে নির্বাসনে যাওয়া গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে হবে রাজনীতিবিদদের। না হলে জনগণকে এর মূল্য দিতে হবে।